‘শাস্ত্রী-কোহলি দাদাগিরি করছে, কোনো কর্মের না নির্বাচকরা’

বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলি এবং হেডকোচ রবি শাস্ত্রীকে নিয়ে ততোই অসন্তোষ বেড়ে চলেছে ঘরে-বাইরে। এই ক’দিন আগেই প্রকাশ্যে আসে ভারত অধিনায়কের সেলিব্রিটি স্ত্রীর ক্রিকেটারদের টিম মিটিং সহ সর্বত্র অবাধ প্রবেশ নিয়ে ভারতীয় তারকাদের বিরক্তির খবর। সামনে এসেছে অনুষ্কা শর্মা ও শিখর ধওয়নের স্ত্রী তথা অস্ট্রেলিয়ান কিকবক্সার আয়েশা মুখার্জির বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় রোহিত শর্মার বিরুষ্কাকে আনফলো করার খবর। এবার টিম ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরে কোহলি-শাস্ত্রী আতাঁত নিয়ে সমালোচনা করলেন প্রাক্তন ভারতীয় তারকা তথা একসময়কার প্রধান জাতীয় নির্বাচক।

ভারতীয় ক্রিকেট দলে হেডকোচ হিসেবে গত বছর রবি শাস্ত্রী কিভাবে নিযুক্ত হন, সে খবর কারওরই অজানা নয়। বিরাট কোহলি আগেকার হেডকোচ অনিল কুম্বলেকে রীতিমতো তাড়িয়ে ছাড়েন টিমের অভ্যন্তরে পরিবেশ গুমট করে তুলে। কুম্বলের প্রস্থানের খবর একপেশে ক্ষমতাপ্রয়োগ করে বাইরে বেরতেও দেননি কোহলি। সতীর্থ ক্রিকেটারদের সতর্ক পর্যন্ত করে দিয়েছিলেন, যাতে কোনওরকম তথ্য বাইরে না ফাঁস হয়ে যায়। বর্তমান ভারত অধিনায়কের ইয়েসম্যান হিসেবে শাস্ত্রীর চাকরি হওয়ার পর টিমে প্রবেশের জন্য ইয়ো-ইয়ো টেস্ট বাধ্য করে দেন বিরাট। আর সেই কাজে অধিনায়ককে পূর্ণ সমর্থন দেন শাস্ত্রী। যুবরাজ সিং’য়ের মতো তারকাকে শ্রেফ ফিটনেস না থাকার অজুহাতেই দল থেকে ছেঁটে ফেলা হয়। আইপিএল ক্রিকেটে ফর্ম হারিয়ে ফেরত আসতে না পারা তো তার পরের কথা।

virat kohli with ms dhoni with ravi shastri

ভারতীয় সিনিয়র দলে কোহলি-শাস্ত্রী জুটি নিয়ে যখন নানা রকম কথা চলছে, ঠিক সেই সময় বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন ভারতের প্রাক্তন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান সৈয়দ কিরমানি। এমএসকে প্রসাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নির্বাচক মণ্ডলীকেউ ছেড়ে কথা বললেন না ভারতের কিংবদন্তি উইকেটকিপার। একটানা না খেলিয়ে তাঁকে রিজার্ভ বেঞ্চের সঙ্গী করে ঘোরানো হলো এবং অযাচিতভাবে স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে, তাতে হতাশা প্রকাশা করেছেন করুণ নায়ার। আর ওদিকে ইংল্যান্ডে টেস্টে সিরিজের মাঝপথেই বাদ পড়েন তারকা ওপেনার মুরলি বিজয়। তারপর থেকে তিনি উপেক্ষিত। নায়ার এবং বিজয়ের বক্তব্য হলো, তাঁদের স্কোয়াড থেকে ছেঁটে ফেলা হলেও, নির্বাচকমণ্ডলীর পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঠিকমতো বার্তা দেওয়া হয়নি। তাঁরা জানেনই না যে তাঁদের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার নিয়ে ঠিক কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলো! বিসিসিআই বলছে, দু’জনেই অন্যায় করেছেন। ফলে, শাস্তির কবলে পড়তে হতে পারে। কারণ, দু’জনেই যেহেতু চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটার, তাই কোনও সিরিজে অংশ নেওয়া বা ট্যুর থেকে ফেরার ৩০ দিনের মধ্যে কোনও মন্তব্য করা যাবে না সে নিয়ে।

একটি সর্বভারতীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিরমানি এ প্রসঙ্গে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন কোনও রকম ভণিতার মধ্যে না গিয়ে।

”আমাকে জিজ্ঞাসা করলে আমি বলব, রবি শাস্ত্রী আসল নির্বাচক। কারণ ও কোচ। ও এবং অধিনায়ক আর টিমের সিনিয়র সদস্যরা আলোচনা করবে আর সিলেকশন কমিটির সামনে সেটাই রাখবে।”

এরপরই বর্তমান জাতীয় নির্বাচকমণ্ডলীর অপরাগতাকে সামনে তুলে ধরে কিরমানি বলেন –

”পূর্ণ সম্মান দিয়েই বলছি, বর্তমান সিলেকশন কমিটি ওই দু’জনের (কোহলি এবং শাস্ত্রী) কাছে আনকোরা। কোহলি আর শাস্ত্রীর সঙ্গে তর্ক করার মতো অবস্থায় যাওয়ার চেয়ে, ওরা টিম ম্যানেজমেন্টের কথা শুনছে। কারণ, ওরা (কোহলি ও শাস্ত্রী) অনেক বেশি অভিজ্ঞ।”

কিরমানি ২০০০ সালের আগে ভারতীয় ক্রিকেট দলের নির্বাচক পদে ছিলেন। ৬৮ বছরের এই প্রাক্তন ভারতীয় তারকা দেশের হয়ে ৮৮টি টেস্ট এবং ৪৯টি ওডিআই খেলেছেন। সেই তুলনায় বর্তমান জাতীয় নির্বাচক মণ্ডলীতে যে পাঁচ সদস্য আছেন, তাঁদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অভিজ্ঞতা একেবারেই ধারে কাছে আসে না। চেয়ারম্যান এমএসকে প্রসাদ দেশের হয়ে ৬টি টেস্ট এবং ১৭টি ওডিআই খেলেছেন। কবে এসেছেন আর কবে অবসর নিয়েছেন, সেই স্মৃতিও ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে নেই। বাদ বাকি চার জন সরণদীপ সিং দেশের হয়ে ২টি টেস্ট ও ৫টি ওডিআই খেলেছেন। হরভজন সিংয়ের কারণে বিবেচনার বাইরে থেকে গিয়েছেন কেরিয়ারের পুরো সময়টাই। দেবাঙ্গ গান্ধী ভারতের হয়ে ৪টি টেস্ট ও ৩টি ওডিআই খেলেছেন। পারফর্ম করতে না পারায় দলে থেকে বাদ পড়েন। আর গগন খোডা ২টি ওয়ান-ডে ম্যাচের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেন অবসরের আগে। ফলে, বোঝাই যাচ্ছে, বর্তমান জাতীয় নির্বাচক মণ্ডলীর একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ এবং অভিজ্ঞতা কাকে বলে, তা ঠিকমতো জানা নেই পাঁচজনের। ফলে, কোন ভিত্তিতে কোহলি এবং শাস্ত্রীর সঙ্গে তাঁরা যুক্তির লড়াইতে নামবেন?

১৯৮৬ সালে ক্রিকেটার হিসেবে অবসর নেওয়া কিরমানি বলছেন –

”নির্বাচনে ভাগ্যের ব্যাপারটাও থেকে যাচ্ছে। আমার কথা ধরুণ। আমার কেরিয়ারের পিক ফর্মেও আমাকে বিবেচনায় আনা হয়নি।”

ভারতীয় ক্রিকেটে মহেন্দ্র সিং ধোনির আবির্ভাবের আগে কিরমাণিকেই সর্বকালের সেরা উইকেটকিপার বলা হতো। তরুণ ভারতীয় তারকা ঋষভ পন্তকে নিয়েও অনেক কথা বললেন তিনি।

১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী কপিল বাহিনীর অন্যতম সদস্য বলছেন –

”ও এখন উইকেটকিপিংয়ের শৈশবস্থার মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও ও(ঋষভ) শিশু। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, (ব্যাটিং) টেকনিক নিয়ে কোনও কোচ এখন আর কথা বলে না। পারফর্ম্যান্সটাই বড় কথা আর সেটা এমএস ধোনি দেখিয়ে দিয়েছে। তরুণ তারকাও ধোনির ব্যাটিং আর কিপিং অনুসরণ করার চেষ্টা করছে।”

“তবে, প্রথাগত টেকনিক তো লাগবেই। ব্যাটিংয়ে না হয় ও ম্যানেজ করে নেবে। কিন্তু, কিপিংয়ে? কিপিংয়ে তো একটা ধরণ মেনে চলতেই হবে। ক্ষীপ্রতা থাকতে হবে, নজর ভালো থাকতে হবে।”

”আজকালকার দিনে চোখে চশমা পরে খেলার চল এসেছে। আমি বলব, যখন তোমার নিজেরই ভালো দৃষ্টি রয়েছে, তখন চোখের সামনে কাঁচ দেওয়ার দরকার কি হে! আরে ওতে তো বলটা ঠিকমতো দেখতে পাবে না। তোমার আন্দাজটাও ঠিকমতো হবে না। ক্যাচ বা স্টাম্পিং মিস হয়ে যাবে তো!”

কিপিংয়ের সময় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, স্পিনাররা ডেলিভারি ফেলার আগেই পন্ত উঠে দাঁড়িয়ে পড়ছেন বল ধরার জন্য। কিরমানি সেই ত্রুটিটাও দেখানোর চেষ্টা করেছেন। আর তার জন্য সমাধানটাও বাতলে দিয়েছেন।

”ওকে কি করতে হবে? বোলার টার্ন নেওয়ার আগে বুড়ো আঙুলের ভর দিয়ে তৈরি থাকতে হবে। উবু হয়ে বসে থাকতে হবে। এটাই প্রাথমিক পাঠ। ওই রকম উবু হয়েই বসে থাকতে হবে, যতক্ষণ না বল পিচে পড়ছে। তারপর ওকে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। তখন বলের সুইং, বাউন্স অনুযায়ী সে দিকে যাক।”

”উইকেটকিপারের দক্ষতা একমাত্র স্পিনারদের বল করার সময়ই টের পাওয়া যায়। পেসারদের বিরুদ্ধে যে কেউই কিপিং করতে পারবে। কারণ, নড়াচড়া করা আর আন্দাজ করার জন্য অনেক সময় পাওয়া যায়। কিন্তু, স্টাম্পের অতো কাছে দাঁড়িয়ে ভগ্নাংশ সেকেন্ডের সময় থাকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য ক্যাচ বা স্টাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে।”

কিরমাবনির বক্তব্য, ভারতের সর্বকালের সেরা অধিনায়ক এবং কিংবদন্তি উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানের প্রতিভা বিরল, সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে, তরুণ ক্রিকেটারদের তাঁকে কখনই অনুসরণ করা উচিত নয়।

”কোনও বল যখন ছোঁড়া হচ্ছে, তখন তা ধরার সময় স্টাম্পের ঠিক পিছনে থাকতে হয়। ধোনি যেরকমটা করে ওরকম মোটেই নয় (কখনও কখনও ধোনি সামনে এসে বল সংগ্রহ করেন)। ওটা ঠিক টেকনিক নয়। স্টাম্পের ঠিক পিছনে থাকা উচিত। বল কোথায় পিচ করছে, সেটা আন্দাজ করার জন্য দৃষ্টির ভারসাম্য থাকা উচিত।”

”হ্যাঁ, যেটা বলছি, সেটা শুধু বলে দেওয়া ঠিক নয়। করে দেখানো উচিত। তবে, এখনও পর্যন্ত আমাকে কেউ উইকেটকিপিং দেখানোর জন্য কোচিং করতে ডাকেনি। তাতে আমি হতাশ। আমার অভিজ্ঞতা অপচয় হচ্ছে।”

ভারতীয় দল দীর্ঘ সময় ধরে এমন একজন উইকেটকিপারকেই সবসময় খুঁজেছে যিনি ব্যাটটা ভালো করে করতে জানেন। কিন্তু, কিরমানি বলছেন, কিপিংটা সবসময়ই স্পেশালিস্টদের কাজ।

”আমি যখন শুরু করেছিলাম, তখন জানতাম না যে উইকেটকিপার হয়ে জন্মাতে হয়। ১৯৭১ সালে (প্রাক্তন ইংলিশ উইকেটকিপার) অ্যালান নটের সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয়। তো আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম – আচ্ছা, উইকেটকিপার হয়ে জন্মাতে হয়, লোকজন কেন বলে? তো উনি আমাকে বলেছিলেন, ‘দেখো প্রথম দিন থেকেই তোমার ভালো নজর থাকতে হবে। আর সেই মতো নমনীয় আর ক্ষীপ্র হতে হবে।’ ভারতীয় দলে ক’জন এরকম আছে? আমার সময় যতদূর মনে পড়েছে, গ্রেট একনাথ সোলকরকেই ভাবতে পারতাম।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: