বাঙালি, মহালয়া আর বাঙালির দুগ্গাপুজোর আদি কাহিনী

বাঙালি আর বাঙালির দুগ্গাপুজো। কোনও কথা হবে না। এটা বছরের সেরা উৎসব বাঙালির। দুর্গাপূজোর শুরু ষষ্ঠী দিয়ে আর শেষ দশমীর বিসর্জনে। ভারতের কোথাও কোথাও এই সময় পুজো আবার দশদিন ধরে চলে। নবরাত্রির ডান্ডিয়া নাচ তো শুনেইছেন। কিন্তু, বাঙালির দুর্গাপুজো সবসময়ই আলাদা। বাঙালির স্ববাসে যেমন পুজো করে উৎসবমুখর হয়ে, তেমনই বাঙালি পরবাসেও উৎসবে মেতে ওঠে। ভিন্ন রাজ্যে হোক, কিংবা ভিনদেশে, বাঙালি যেখানে, বাঙালিয়ানা সেখানে। আর বাঙালিয়ানা যেখানে, মোদের দু্গ্গাপুজোও সেখানে। পৃথিবীর অন্যতম মিষ্টিভাসাতে কথা বলা মানুযের সেরা উৎসবটা আশ্বিনের মাসে অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়। মহালয়াতে।

বাঙালির পুজো শুরু বীরেন্দ্রর সুরে…

বছরে তো অনেক ষষ্ঠীই আসে। তবে, দুর্গাষষ্ঠী বছরে ওই একবার আসে। তাই ওটা মহাষষ্ঠী। এরপর একে একে আসে মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী আর সবশেষে মহানবমী। এই পাঁচটা দিন বাঙালি মায়ের পুজো-অর্চনায় মেতে থাকে। ওই যে দুর্গাষষ্ঠী, তার ঠিক সপ্তাহখানেক আগেই শুরু মহালয়ার মাধ্যমে মাতৃ বন্দনায় মেতে ওঠে বাঙালি। পরিবেশে শরতের আমেজ যেমন চলে আসে, তেমনই ভাসে পুজো পুজো গন্ধ। বাঙালির অভ্যেস ভোরবেলাটা বীরেন্দ্র কৃষ্ঠ ভদ্রের কণ্ঠে মাতৃবন্দনা দিয়ে শুরু করা। এমন বাঙালি নেই যে একবারও ভোরবেলা উঠে মহালয়ার দিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমৃতকণ্ঠ শোনেনি রেডিওতে।

একি আর আজকের কথা। সেই ১৯৩০ সাল থেকে চলে আসছে ব্যাপারটা। প্রথমবার মহলয়া সেবারই সরসরি সম্প্রচারিত হয় আকাশবাণী কলকাতা থেকে। মহীষাসুর মর্দিনী মা দুর্গার কাহিনী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁর দীপ্ত কণ্ঠে ফুটিয়ে তোলেন। সেই থেকে বাঙালির দুর্গাপুজোর এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে বীরেন্দ্র কণ্ঠ। তিনি ইহলোক থেকে পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন, কিন্তু কণ্ঠে অমর হয়ে রয়েছেন বাঙালির ভালোবাসা আর ভালোলাগার মধ্য দিয়ে। আর আমাদের মা দুর্গা ওই দিন তাঁর শ্বশুরবাড়ি কৈলাস ছেড়ে ধরাধামে আসেন বাপের বাড়িতে। ছেলেমেয়ে নিয়ে পাঁচদিন কাটিয়ে তারপর তিনি আবার শ্বশুর বাড়ি রওনা দেন বিজয়া দশমীর দিন।

মহালয়া ও দুর্গাপুজোর ইতিহাস…

পুরাণ মতে দৈত্যসম্রাট মহীষাসুর দশ হাজার বছর ধরে কঠোর সাধনা করেন দেবাদিদেব মহাদেবসহ ত্রিদেবের। মহীষাসুরের তপস্যায় খুশি হয়ে ত্রিদেব তাকে বর দেন। আর তাতে মহাবলশালী হয়ে ওঠে দৈত্যরাজ। স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল – তিন লোকে নিজের আধিপত্য কায়েম করতে প্রচণ্ড অত্যাচার শুরু করে সে। দেবরাজ ইন্দ্রসহ সবাই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তাতে। মহীষাসুরকে বধ করাও তাঁদের সাধ্যে ছিল না। কারণ, বাবা ভোলানাথের কাছে মহীষাসুর অমরত্বের বর চান। কিন্তু, শিব চাতুরি করে তাঁকে এই কথা বলেছিলেন, কোনও পুরুষ তাকে হত্যা করতে পারবে না তিন লোকে, একমাত্র কোনও মহিলা ছাড়া। নিজদর্পে অন্ধ মহীষাসুর মহিলাদের দুর্বল জ্ঞন করত। তার ধারণা ছিল, কোনও মহিলা তার সঙ্গে শক্তিতে পেরে উঠবেন না।

স্বর্গ আর মর্ত্যলোক যখন মহীষাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, সেই সময় ত্রিদেব একত্রিত হয়ে এক নারীশক্তি দুর্গার সৃষ্টি করেন নিজেদের তেজ দিয়ে। তিনিই মা দুর্গা। ত্রিদেবসহ বাকি সমস্ত দেবতাও নিজেদের অস্ত্র হাতে তুলে দেন দশভূজার হাতে। ধরাধাম ও স্বর্গকে মহীষাসুরের অত্যাচার মুক্ত করতে মা দুর্গা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং তাকে সতর্ক করেন। কিন্তু, ক্ষমতা বলে অজ্ঞ মহীষাসুর তা অবজ্ঞা করলে যুদ্ধ অবসম্ভাবী হয়ে পড়ে। তীব্র যুদ্ধের পর মহীষাসুর মা দুর্গার হাতে বধ হন। তিন লোক মহীষাসুরের অত্যাচার মুক্ত হয়। সৃষ্টি হয় শান্তি ও খুশির বাতাবরণ। সেই থেকেই মাতৃবন্দনা হয়ে আসছে ধরাধামে।

পুরাণ এটাও বলে, শ্রীরামচন্দ্র মহালয়ার দিন দেবীর অকাল বোধন করেছিলেন। সেই থেকেই এই রীতি চলে আসছে। দেবী দুর্গার আরাধনার দিন আসলে বসন্ত কাল। কিন্তু, ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র তাঁর পত্নী মা সীতাকে দৈত্যরাজ রাবণের হাত থেকে মুক্ত করতে লঙ্কা যাত্রা করেন। তার আগে তিনি দেবীদুর্গার আশীর্বাদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর আরাধনা করবেন ঠিক করেন। শ্রীরাম জানতে পারেন, দেবী একমাত্র ১০৮টি নীল পদ্ম পেলে তুষ্ট হন। পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করে মাত্র ১০৭টি নীলকমল জোগাড় করার পর নিজের চোখ তিনি দেবীকে উৎসর্গ করেন। রামের চোখকে নীলপদ্মের সঙ্গে তুলনা করা হতো। দেবী তাতে খুশি হয়ে শ্রীরামকে বর দেন তিনি জয়ী হবেন। সপ্তমীর দিন যুদ্ধ শুরু হয় এবং অষ্টমী এবং নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণ মারা পড়ে রামের হাতে। আবার কোনও কোনও মতে দশমীর দিন প্রাণ ত্যাগ করে লঙ্কারাজ রাবণ। সেই থেকে দুর্গাপুজো আশ্বিন মাসে হয়ে আসছে। দক্ষিণে দশেহরা উৎসব এই কারণেই পালন করা হয়। সেখানে দশদিন ধরে চলে উৎসব এবং শেষদিন কুশপুত্তলিকা দাহ হয় রাবণের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: