জিত্ আর দেব দুজনের দুর্বলতা ঠিক কোন কোন জায়গাগুলো, যাতে তাদের নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে

জিত আর দেব। গত দশ বছর ধরে টলিউডের তথাকথিত মূল বানিজ্যিক ধারার সিনেমায় এই দুজনেই রাজ করছেন। একটা সময় টলিউডে ছিল প্রসেনজিত চ্যাটার্জি -তাপস পালের লড়াই। তারপর ব্যাটন বদলে সেটা এখন জিত-দেবের ডুয়েল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসেনজিত এখন আছেন ফাদার ফিগার হয়ে।

জিত আর দেব। দুজনেরই রাজ্যজুড়ে অগণিত ভক্ত। তাদের সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়া মানেই, সিনেমা হলের বাইরে লাইন, ছবির পোস্টারে মালা। কিন্তু দুজনকে নিয়েই সমালোচনা হয় খুব। অবশ্য যাদের যত নাম, তাদের নিয়ে তো সমালোচনা হবেই। আসুন দেখে নিই জিত ও দেবের এমনই পাঁচ দুর্বলতা নিয়ে যা নিয়ে তাদের ভেবে দেখতে হবে—

জিত-এর পাঁচ দুর্বলতা

৫) ছবি বাছাতে ভুল হচ্ছে
ছবি বাছার ওপরেই একজন অভিনেতার কেরিয়ারের ৬০ শতাংশ দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে গড়বড় হলেই বিপদ। আবার সেটা ঠিকঠাক থাকলেই কোথা থেকে কোথায় চলে যাওয়া যায়। ছবি বাছাতে হলে একটা ভারসাম্যও রাখতে হয়। জিত সেটা একেবারেই রাখতে পারেননি। নিজেকে একেবারে বাজার চলতি তথাকথিত ফর্মুলা বানিজ্যিক সিনেমার মধ্যেই আবদ্ধ রেখেছেন। ২০১৪ সালে ‘রয়াল বেঙ্গল টাইগার’-এর পর জিত-এর সব ছবি সেই একমুখি। তাতে অবশ্য সাফল্যও পেয়েছেন। কিন্তু নয় নয় করে ১৬ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানোর পর নিজের ছবি বাছা, বা তৈরি করার (যে হেতু তিনি এখন প্রযোজকও) ব্যাপারে আরও যত্নশীল হতে হবে। মফস্বলের ব্র্যান্ড ‘জিত দা’যেমন চলছে চলুক, এবার একটু অন্য ধরনের সিনেমার দিকেও মন দিন।

আমির খান ২০১০ সালের দিকে একটা কথা বলেছিলেন, তিনি এবার থেকে একটা সিনেমা করবেন পকেটের কথা ভেবে আর একটা মনকে ভাল রাখার জন্য। তাই আমির যেন পিকে তে অভিনয় করেছেন, তেমনই আবার ধুম-এও অভিনয় করেছেন। অবশ্য বলিউড অনে অনেক বড় পরিসর। টলিউডে বাজেট কম, ছবির সংখ্যাও সীমাবদ্ধ। কিন্তু স্বল্প বাজেটের অন্যধারার সিনেমাতেও চেষ্টা করুন।

৪) বড় প্রযোজক সংস্থা ছেড়ে যে সাহস দেখালেন তা দেখা যাচ্ছে না ছবি করার মানসিকতায়

বড় প্রযোজক সংস্থার বিরুদ্ধ মুখ খুলে তিনি স্বাধীন হয়েছেন। কিন্তু ছবি করার বিষয়ে সেই সাহস দেখাচ্ছেন না। নিজেকে বাদশা দা ডন, ইন্সপেক্টর নটি-কে তেই আটকে রেখেছেন। তিনি যে প্রযোজক সংস্থার বিরুদ্ধে জেহাদ করেছেন. তাদের একটা সময়ের সেই দক্ষিণী টোকা ফর্মুলাকেই পালন করেছেন। ভুল গেলে চলবে না, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু চাঁদের পাহাড়ের মত সিরিজে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।

৩) তাঁর পুরনো সিনেমাগুলো দেখছেন না
আমি কোন ঈশ্বর নই যে ছেড়ে দেবো, রাক্ষস নই যে মেরো, আমি হলাম পুলিস… শা. ছাড়া আর মারা মাঝখানে লটকে দিই।।।। এই ধরনের ডায়লগ দিয়ে জিত হাততালি কুড়োন। সেটা তো ভাল কথা। দর্শকদের হাততালিই তো একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কিন্তু সাথী-র মত সিনেমায় তাঁকে তেমন কোনও ডায়লগ দিতে হয়নি। কিংবা বন্ধন-এও তেমন করতে হয়নি। তাঁর ওমন ধরনের পুরনো সিনেমাগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন কোথায় ভুল হচ্ছে তাঁর।

২) বেসিক ঠিকঠাক হচ্ছে না
গত চার বছরে তাঁর আট-নটা মত সিনেমা রিলিজ করেছে। তার মধ্যে চার পাঁচটা মন্দ চলেনি। দুটো বড় হিট দিয়েছে। কিন্তু জিত সেই আগের সাফল্য পাচ্ছেন না। আসলে বেসিকে কোথাও একটা সমস্যা হচ্ছে। মানুষ কী তাহলে তাঁকে আরও একটু অন্যরকম চরিত্রে দেখতে চাইছেন।

১) হিট, মেগা হিটের চক্করে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন
একজন অবিনেতা, বিশেষ করে নায়ক চান তাঁর সিনেমা হিট, সুপার হিট, বাম্পার হিট হোক। কিন্তু তা বলে সেই চক্করে নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়। জিত-এর অভিনয় প্রতিভা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। তিনি চেনা ছকের বাইরে অন্যরকম ছবিতে ভালই করবেন। কিন্তু জিত চেনাছক ভাঙার সাহস দেখাচ্ছেন না। এটাই সেরা সময় ভাঙার। হিট, মেগা হিটের চক্করে নিজেকে হারিয়ে না ফেলে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলুন।

দেব-এর পাঁচ দুর্বলতা

৫) উচ্চারণে শুধরেছেন, কিন্তু উন্নতি করতে পারছেন না
দেবের উচ্চারণ কোনও দিনই ভাল নয়। চ্যালেঞ্জ সিনেমায় তাঁর উচ্চারণটা সত্যি কানে লাগার মত খারাপ ছিল। তবে গত তিন বছরে সেটা শুধরছেন। কিন্তু শোধরানো এক কথা আর উন্নতি আরেক। মনে রাখতে হবে দেব এখন কেরিয়ারের এমন জায়গায় আছেন যেখানে তাঁকে বেশ কিছু জায়গায় উন্নতি করতে হবে। তাঁর সিনেমা লোকে গোগ্রাসে গিলছে, এমন সময় সামান্য ত্রুটিও বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। মানুষ তখন সেটাকে নিয়েই খিল্লি করতে পারে। মনে রাখতে হবে, কারও দিকে নজর পড়লেই, তবে সে টেরা সেটা টের পাওয়া যায়।

৪) অভিনয়ে এখনও পরিণত হল না
টলিউডে গোটা ৩৫ সিনেমায় কাজ করে ফেলেছেন। অন্তত পাঁচটা মেগাহিট। বুনো হাঁস থেকে আরশি নগর। পাগলু থেকে বাওলি আনলিমিটেড। সব ধরনের সিনেমায় অভিনয় করছেন। কিন্তু এখনও অভিনয়ে পরিণত বোধের স্পষ্ট অভাব। গত বছর পুজোয় ককপিট-এর ভাল সিনেমায় জিত-এর অভিনয় সেই কবেকার চ্যালেঞ্জ-এর দেবকেই মনে করাচ্ছে। ফিল্মোগ্রাফি খুব স্ট্রং হচ্ছে, কিন্তু অভিনয়ে ততটা নয়। ব্যাপারটা অনেকে সিভি-টা স্ট্রং, কিন্তু কর্মদক্ষতাটা বাড়ছে না। সেটা ভেবে দেখতে হবে দেবকে।

৩) অনেক বড় হিট, কিন্তু তাতে তিনি ততটা থাকছেন না
চাঁদের পাহাড়। অ্যামজন অভিযান। বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় দুটো মেগা হিট সিনেমা-র তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু তাতে তিনি কতটা! এটা বললে তাঁর ভক্তরা রে রে করে উঠতে পারেন। বলতেই তিনি যতটা, যতটা তাঁর চরিত্র। কিন্তু আমরা বলব, অভিনেতা সেখানেই যিনি চরিত্রের বাইরে বেরিয়ে সেটাকে একটা শেপ দেন। বাঙালীর শঙ্কর তিনি, কিন্তু শঙ্করকে আলাদা শেপ দেওয়ার কোনও চেষ্টাই করেননি। তাই তাঁকে যত মানুষ দেখতে গেলেন হলে, তাঁর থেকে অনেক বেশি মানুষ গেলেন শঙ্করকে দেখতে। সেটাও স্বাভাবিক। কিন্তু দেবকে ভেবে দেখতে হবে, একটা সিনেমা বড় হিট করছে তাতে তিনি কতটা। চরিত্র, নামী পরিচালক, বড় প্রযোজক সংস্থার ব্যানারে তিনি ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন না তো!

২) শুধু পরিচালকরে কথাতেই অভিনয় করেও যাওয়া নয়, নিজেরও একটা সিগনেচার আনুন
অভিনেতাদের পরিচালকের প্রতিচ্ছবি হতে হয় ঠিকই। পরিচালকরা যেমনটা চান, তেমনটাই তুলে ধরেন তাঁরা। তবে তার মধ্যে নিজস্বতা আনাটাও একটা ব্যাপার থাকে। কিন্তু দেবের সেসবের বালাই নেই।

১) প্রোডিউসারস অ্যাক্টর না হয়ে, অ্যাক্টর হয়ে প্রোডিসারদের বুঝিয়ে দেওয়া
ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। প্রযোজক সংস্থার ইয়েস ম্যান হয়ে না থেকে। এবার নিজেও কিছু করুন।এত সমলাচোনা শুনলে মনে হবে আমরা বোধহয় দুজনের নিন্দুক। তাঁকে কিন্তু মোটেও না। জিত-দেব। দুজনেই বাঙলা সিনেমাকে ধরে রেখেছেন, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আরও ভাল সিনেমা করুন দুজনে। আরও আরও দর্শক হোক তাঁদের সিনেমায়। আমরা শুধু ওনাদের মনে করিয়ে দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: