বাঙলা সিনেমার সেরা দশ কমেডিয়ান, যাদের জন্য বাঙালী মনখারাপের মাঝে হেসেছে

১০) খরাজ মুখার্জি


খুব কঠিন সময়ে তিনি বাঙালীকে হাসিয়েছেন। ১৯৮০ সালে হুলস্থুল সিনেমার মাধ্যমে কেরিয়ার শুরু করলেও খরাজকে টলিউডে প্রথম খ্যাতি এনে দেয় ২০০৩ সালের সিনেমা পাতালঘর। তারপর একের পর এক সিনেমায় খরাজের দুরন্ত অভিনয়, মাপা কমেডি। খরাজের কমেডি-র সবচেয়ে বড় দিক হল ভাঁড়ামোহীন, একেবারে মেপে অভিনয়। কমেডিয়ান হিসেবে অভিনয় করতে হলে পরিমাপ জ্ঞানটা, টাইমিংটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বেলাশেষে সিনেমায় খরাজের কমেডিটা ঠিক তেমন ছিল। আবার ‘বাই বাই ব্যাঙ্কক’সিনেমায় খরাজ মোটা দাগের চরিত্রে কমেডি করলেও সেখানেও সুক্ষ্মতা দেন। টলিউডে কাহানি, কিংবা অক্ষয় কুমারের স্পেশাল ২৬-এ একেবারে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অভিনয় করে খরাজ এমন অভিনয় করেছিলেন, যা তাঁকে আলাদা জায়গায় নিয়ে যায়। আগামী দিনে তাঁর কাছ থেকে আরও ভাল কাজের অপেক্ষায় দর্শকরা।

৯) কিশোর কুমার


সিং নেই তবু নাম তার সিংহ ডিম নয় তবু অশ্বডিম্ব গায়ে লাগে ছ্যাঁকা ভ্যাবাচাকা হাম্বা হাম্বা টিকটিক টিকটিক দাও ভাই নাকে এক টিপ নস্যি খাও তারপরে একমগ লস্যি লাগে ঝুরি ঝুরি সুড়সুড়ি হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো ছিকছিক ছিক ছিক…১৯৫৮ সালে লুকোচুরি সিনেমায় ডবল রোলে অভিনয় করে কিশোর কুমারের সেই দুরন্ত কমেডি রোলটার কতা কেউ ভুলতে পারে! গানের মতো তিনি কমেডিতেও নিজস্ব একটা স্টাইলে সুর, তাল প্রয়োগ করতেন, তাই গোটা দেশের মত বাঙালীদের কাছে তিনি অত্যন্ত পছন্দের কমেডিয়ান। দাদা অশোক কুমারের হাত ধরেই সিনেমায় এসেছিলেন কিশোর কুমার। তার ফিল্মি ক্যারিয়ার শুরু হয় চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বোম্বে টকিজে। এখানেই কাজ করতেন অশোক কুমার। নামটিও তখনই বদলে ‘কিশোর কুমার’ হয়। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ১৯৪৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শিকারী’। সিনেমাটিতে নায়ক ছিলেন অশোক কুমার। বোম্বে টকিজের সিনেমা ‘আন্দোলন’-এ তিনি প্রথম নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন। মধুবালার বিপরীতে তার সিনেমাগুলো বেশ সাফল্য পায়। বিশেষ করে কমেডি নায়ক হিসেবে ছিলেন অনবদ্য। ‘নিউদিল্লি’, ‘চালতি কা নাম গাড়ি’, ‘হাফ টিকেট’, ‘আশা’ ইত্যাদি ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সুপারহিট ‘পারোসান’ সিনেমায় তিনি নায়ক সুনীল দত্তর বন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করেন।

৮) চিন্ময় রায়


তাঁকে গোটা রাজ্য চেনে টেনিদা নামে। ১৯৭৮ সালে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা উমানাথ ভট্টাচার্যের লেখা চারমূর্তি সিনেমায় টেনিদা-র ভূমিকায় চিন্ময় রায়ের অবিনয় বাঙালী কোনওদন ভুলতে পারবে না। ননী গোপালের বিয়ে থেকে পদী পিসির বর্মী বাক্স, গল্প হলেও সত্যি থেকে ‘হাটে-বাজারে’। চিন্ময় রায়ের কমেডি বাঙালীকে সব সময় হাসিয়েছে।

৭) জহর রায়


এই দেখো, আবার খোকা-খোকা কথা বলে! দু’দিন ভাল করে একটু যুদ্ধু করে নাও, তারপর তোমার ছুটি। জহর রায় বলতেই হাল্লার মন্ত্রীমশাই ভেসে ওঠেন চোখের সামনে। রাজাকে যিনি যুদ্ধ বাধানোর কুমন্ত্রণা দিতেন, যাঁর চারধারে ঘুরে ঘুরে গুপী গান গেয়েছিল আর বাঘা ঢোল বাজিয়েছিল ও মন্ত্রীমশাই ষড়যন্ত্রীমশাই! কিন্তু সত্যজিতের গুগাবাবা ছাড়াও তো আরও কত ছবিতে তাঁর অসামান্য অভিনয়। ঋত্বিকের সুবর্ণরেখা-য় মুখুজ্যেবাবু, ছাতিমপুর স্টেশন থেকে নিয়ে যাওয়ার পথে ছোট্ট সীতাকে যিনি স্বপ্নের নতুন বাড়ি চিনিয়েছিলেন। অভিনয়ের এই ব্যাপ্তি বুঝিয়ে দেয় জাত-অভিনেতা তিনি, চরিত্রাভিনেতা। কমেডিতে আটকে না থেকে তিনি পৌঁছে যেতেন নতুন নতুন চরিত্রে। ‘ভানু পেল লটারি’ এবং ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’…এর মধ্যে প্রথম ছবিটি থেকে ভানু-জহরের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। গ্রাম্য ভানুর সেই “জহুরে” সম্বোধন এক কথায় অনবদ্য। জহর রায়ের সঙ্গে ভানুর একটা অসম্ভব রসায়ন ছিল, তাঁদের কমিক টাইমিং, সংলাপ বলার ধরন এবং দুজনের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং এতটাই ছিল যে সেইসব ছবি যারা না দেখেছেন তাদের পক্ষে অনুধাবন করা শক্ত। অবশ্য ভানু-জহর জুটির ছবি দেখেননি, এরকম বাঙালী মনে হয় খুব বেশি নেই।

৬) রবি ঘোষ


গুপি গাইন, বাঘা বাইনের…বাঘা তিনি। গল্প হলেও সত্যি-র সেই জাদুকর চাকরটা তিনি। ছায়া-ছবি-রবি. যত দিন অভিনয়ে ছিলেন, তত দিনই ভাল বাংলা ছবির জন্য অপরিহার্য ছিলেন তিনি। বিভিন্ন ছবি ও নাটকে তাঁর উপস্থিতি যে সব অনবদ্য মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিল, তা বাঙালি মানসে চির-অমলিন। অভিনয় জীবনের যাত্রাপথের দু’পাশে যে সব মণি-মুক্তো ছড়িয়ে গিয়েছেন রবি ঘোষ। রবি ঘোষ বিভিন্ন ধরণের চরিত্রে অভিনয় করে বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে তিনি সবচেয়ে পরিচিত তার হাস্যরসাত্মক চরিত্র রূপায়নের জন্য। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে তাকে নিয়মিত অভিনয় করতে দেখা গেছে। চলচ্চিত্র ছাড়াও তিনি বাংলা নাট্যমঞ্চ এবং টেলিভিশন তথা ছোট পর্দায় অভিনয় করেছেন। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত গুপী গাইন বাঘা বাইন চলচ্চিত্রে বাঘা চরিত্রে অভিনয় করার জন্য তিনি সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার। ১৯৪৯ সালে তিনি সাউথ সুবর্ধন মেইন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ইন্টারপাস করে তিনি আশুতোষ কলেজ-এ ভর্তি হন, গ্রাজ্যুয়েশনের জন্য। ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত তিনি বংশাল কোর্টে কাজ করেন। তিনি অভিনেত্রী অনুভা গুপ্তকে বিয়ে করেন। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর দশ বছর পর তিনি ২৪শে নভেম্বর, ১৯৮২ সালে বৈশাখী দেবীকে বিয়ে করেন।

৫) সন্তোষ দত্ত


সত্যজিত রায়ের ফেলুদা-র জটায়ু তিনি। বাঙালীর চিরকালীন সেরা কমেডি চরিত্র-জটায়ু। সত্যজিত রায় বলেছিলেন, খুঁজলে ফেলুদা, তোপসের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দু একজনকে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভূ ভারতে ঘুরলেও জটায়ু-র চরিত্রে সন্তোষ দত্ত ছাড়া কাউকে ভাবা যাবে না। জটায়ু চরিত্রটা আঁকার সময় সন্তোষ দত্ত-ই যেন চলে এসেছিলেন সত্যজিত রায়ের কলমের ডগায়। তবে শুধু জটায়ু নয়, ওগো বধূ সুন্দরীর অবলকান্তের চরিত্রে অভিনয় করেও মন ছুঁয়ে ছিলেন। সেলুলয়েডে প্রথম জটায়ুর আগমন সোনার কেল্লায়। পরিচালনায় সত্যজিৎ রায়। ১৯৭৪ সালে। জটায়ুর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সন্তোষ দত্ত। ১৯৭৯ সালে জয় বাবা ফেলুনাথ ছবিতেও তিনিই হয়েছিলেন জটায়ু। কিন্তু তারপরই তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৮৮ সালে। তারপর সত্যজিৎ রায় আর ফেলুদা করেননি। শুধু জটায়ু পাওয়া যাবে না বলে।

৪) অনুপ কুমার


তিনি আসলে একজন নায়ক, একজন অভিনেতা। কমেডি-র থেকে ট্র্যাজিক চরিত্রে, চোখে জল এনে দেওয়া সিনেমায় বেশি অভিনয় করেছেন। তবু কমেডিয়ান হিসেবে তাঁর জুড়ি মেলা ভার।

৩) উত্॥পল দত্ত


গোলমাল বাধাতে তিনি ওস্তাদ। একটু ভিলেন গোছের কমেডিয়ান। তবে তাঁকে কমেডিয়ান গণ্ডিতে আটকে রাখাটা বোকামো। তিনি বাঙলা সিনেমা, নাটকের সর্বকালের সেরা অভিনেতাদের তালিকায় একেবারে প্রথম দিতে থাকবেন। ভারতীয় সিনেমাতেও তাঁর অবদান কোনওদিন ভোলার নয়।

২) তুলসী চক্রবর্তী


বাংলা সিনেমার তিনি পরশ পাথর। তিনি যে সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন, তাঁর কমেডি-তে সেটা সোনা হয়ে গিয়েছে। অ্যান্ড্রু রবিনসন ‘পরশপাথর’-এ তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘chakravarti recalls Chaplin to his best. Instead of moustache, he has a pair of eyes as bulbous as a frog’s which he opens wide with every emotion known to man.’ যদিও চার্লি চ্যাপলিন সম্পর্কে তুলসী চক্রবর্তী খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন বলে জানা যায় না । তার সম্পর্কে সৌমিত্র চ্যাটার্জির বলেছেন, ‘তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয়ে কোথাও বিদেশের অভিনেতাদের কোনও প্রভাব লক্ষ করা যায় না । সে অভিনয় নিতান্তই দেশজ । দেশের মানুষের চরিত্র লক্ষণের মধ্যেই তার শেকড় খুঁজতে হয়।’ তুলসী চক্রবর্তী সার্কাসে থেকে কিছু খেলা যেমন শিখলেন তেমনি শিখলেন উর্দু ও হিন্দী বলতে । সার্কাসে তিনি ছয়মাস মত ছিলেন । চলে আসার কারণ জিজ্ঞাস করলে বলতেন,‘শরীর থেকে জন্তু জানোয়ারের গন্ধ বেরচ্ছে দেখে চলে এলুম।’ জ্যাঠামশায় তখন ছাপাখানায় কম্পোজিটরের কাজ জুটিয়ে দিলেন । সেখানে থিয়েটারের হ্যান্ডবিল ও পোস্টার ছাপা হত । তা দেখে তার অভিনেতা হতে ইচ্ছে করল । জ্যাঠামশায়কে অনেক অনুরোধ করায় তিনি স্টার থিয়েটারে অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের সাহায্যে ঢোকালেন । সে সময় প্রেসে তার মাইনে ছিল ৩২ টাকা । স্টারে এলেন ৮ টাকার মাইনেতে ! ত্ৎকালীন ষ্টার থিযেটারের মালিক ছিলেন অপরেশ মুখোপাধ্যায় । মাত্র ১৭ বছর বয়সেই চোখে পড়ে যান অপরেশবাবুর । সালটা ছিল ১৯১৬ । এই অপরেশবাবুই তালিম দেন তুলসী চক্রবর্তীকে । টপ্পা গান, পাখোয়াজ বাজানো সব শিখেছিলেন । ধিরে ধিরে তিনি ‘থেটার’ করার সুযোগও পেলেন । ১৯২০ তে প্রথম ষ্টেজে অভিনয় করেন । নাটকের নাম ছিল ‘দুর্গেশনন্দিনী’। ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি ষ্টার থিযেটারেই ছিলেন ।

১) ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

বাঙলার এবং ভারতের সর্বকালের সেরা কমেডিয়ান অভিনেতা। আশিতে আসিও না থেকে ভানু পেল লটারী। মিস প্রিয়ঙ্কবদা থেকে ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসেসিটেন্ট। ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’-এ ভানু অভিনয় দেখে তো বাঙালী হাসতে হাসতে মরেছে। তবে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন অভিনেতা, একজন প্যারালাল নায়কও বটে। “মাসিমা, মালপো খামু!”ভানুর এই ডায়লগটা কখনও ভোলা যাবে! কিংবা স্বর্গে গিয়ে যখন ইন্দ্রদেবকে চ্যালেঞ্জ ঠুকে বলেন…১৯৫৩ সালে মুক্তি পেল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, এবং বলা যেতে পারে যে এই ছবির মাধ্যমেই ভানু দর্শকদের নিজের অভিনয়ের গুণে আকৃষ্ট করা শুরু করেন। এর পরের বছর মুক্তি পায় ‘ওরা থাকে ওধারে’…ঘটি-বাঙালের চিরন্তন বচসা নিয়ে এই ছবি, এবং এখানে ভানুর অভিনয় অনবদ্য। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে এই ছবিতে উত্তমকুমার এবং সুচিত্রা সেন থাকা সত্তেও কিন্তু ভানু তাঁদের পাশে সমানভাবে উজ্জ্বল ছিলেন, বাঙাল গৃহস্বামীর শ্যালক হিসাবে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তাঁর মত কমেডিয়ান বাঙলা কেন ভারতে খুঁজলেও পাওয়া কঠিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: