গলি থেকে রাজপথে কলকাতার একমাত্র মহিলা বাস ড্রাইভার প্রতিমা!

কথায় কথায় যারা নারীবাদের বুলি কপচান কিন্তু সুযোগ পেলেই নারী কোটার সুবিধা নিতে ছাড়েন না, কিংবা যারা কথায় কথায় উদাহরণ দেন মেয়েরা চাকরি করতে পারে, কিন্তু পুরুষদের মত যে কোনো কাজ করতে পারে না, তাদের মুখে ছাই দিয়ে সব কিছুর জবাব দিয়ে চলেছেন বচর ৪০ এর এক সাধারণ বাঙালি গৃহবধু। মেয়ে হলেও যে তিনি যে কোনো কাজ করতে পারেন, সেই প্রমানই তিনি কথায় নয় কাজে দিয়েছেন। তিনি প্রতিমা পোদ্দার।

একবিংশ শতাব্দীর কোলকাতায় যখন মেয়েরা একে একে চালাচ্ছেন স্কুটি বাইক কিং নামীদামী মডেলের শৌখিন গাড়ি, সেই সময় বচর ৪০এর প্রতিমা দেবী কলকাতার রাস্তায় চালাচ্ছেন যাত্রীবাহী বাস। না ভুল পড়েন নি। বাসই চালান প্রতিমা দেবী। আর এই বাস চালিয়েই যোগান দেন সংসারের রুজি রুটি। একদিকে অসুস্থ স্বামী, বৃদ্ধা শাশুড়ি, দুই মেয়ে সকলকেই সামলান তিনি। কথায় বলে যে রাঁধে সেই চুলও বাঁধে। আক্ষরিক অর্থেই তা করেন প্রতিমা দেবী। নিমতা অঞ্চলের বাসিন্দা পেশায় বাস চালক শিবেশ্বর পোদ্দারের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না শিবেশ্বর বাবুর। ফলে প্রথম থেকেই স্বামীর প্রকৃত সহযোগী হয়ে নিজের কিছু করার ইচ্ছা ছিল প্রতিমা দেবীর, যাতে স্বামীর পাশাপাশি তিনি সংসারে কিছু আর্থিক সহযোগিতা করতে পারেন। শেষ পর্যন্ত ঠিক করেন গাড়ি চালানো শিখবেন।

এ ক্ষেত্রে তার পথপ্রদর্শক ও গুরু স্বামী শিবেশ্বর বাবু। স্বামীর ইচ্ছেতে স্বামীর কাছেই গাড়ি চালানোর হাতেখড়ি হয় প্রতিমা দেবীর। তবে এতটাও সহজ ছিলনা তার যাত্রাপথ। এবং সব ক্ষেত্রেই যা হয় তার ব্যাতিক্রম হয়নি প্রতিমাদেবীর বেলাতেও। বাপের বাড়ি, পাড়া প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজনদের প্রবল অনিচ্ছা টিটকারি সব কিছুরই সম্মুখীন হতে হয় তাকে। কিন্তু পাশে পেয়েছিলেন শাশুড়ি এবং ননদ কে। তাই অন্যদের সমস্ত বাধাকে তোয়াক্কা না করে স্বামীর অনুপ্রেরণায় আর শাশুড়ি ননদের সহযোগিতায় গাড়ি শেখা হোল তার। কাজ নিলেন সল্টলেকের এক বেসরকারী হাসপাতালে। কিছুদিন সেখানকার অ্যাম্বুলেন্সও চালান তিনি। এ ব্যাপারে প্রতিমা দেবী জানান, “আমার স্বামীর আমার প্রধান অনুপ্রেরণা। তিনিই আমাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। আমার স্বামীই আমাকে সবসময় বলতেন কোনো কাজই ছোটো নয়, পেশা হোক বা অন্য কোনও ক্ষেত্রে সব জায়গাতেই মেয়েদের সমান অধিকার রয়েছে”।

প্রতিমাদেবীর স্বামী শিবেশ্বর বাবু নিজেও বাস চালাতেন হাওড়া নিমতা রুটের। বেশকিছুদিন স্বামীর সঙ্গে কনডাক্টর হিসেবেও কাজ করেন প্রতিমা। কিন্তু হঠাৎই বদলে যায় জীবনের মোড়। বড়সড় অ্যাকসিডেন্টের মুখে পড়েন প্রতিমার স্বামী। এবং তারপরই বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন শিবেশ্বর পোদ্দার। একদিকে শয্যাশায়ী স্বামী, অসুস্থ বৃদ্ধা শাশুড়ি অন্যদিকে নিজের বাড়ন্ত দুই মেয়ে তাদের পড়াশুনা। কীভাবে চলবে সংসার? ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলেন স্বামীর বাসেরই স্টিয়ারিং ধরবেন তিনি। যেমন বলা তেমনি কাজ। হাওড়া নিমতা রুটের বাস চালানো শুরু হল তার। অসুস্থ স্বামী, শাশুড়িকে সামলে সংসারের রান্নাবান্না সামলে বাস চালাতে শুরু করেন তিনি। আর এভাবেই দুই মেয়ে মানুষও করেছেন তিনি। সুস্থ করেছেন স্বামীকেও। দুই মেয়ে পড়াশুনায় মেধাবি। বড় মেয়ে যাদবপুরে অঙ্ক নিয়ে অনার্স পড়ছে আর ছোট মেয়ে পড়ে ক্লাস নাইনে। শুধু পড়াশুনাই নয় খেলাধূলাতেই এগিয়ে দিয়েছেন মেয়েদের। দুই মেয়ের একজন সাঁতারে অপরজন জিমন্যাস্টিকে ন্যাশানাল খেলে ফেলেছে। বচর চল্লিশের প্রতিমা দেবী নিজেও এক সময় ছিলেন জিমন্যাস্ট। তবে সে বহুকাল আগের কথা। নিজের অপূর্ণ ইচ্ছেকেও মেয়েদের মধ্যে দিয়ে পূরন করেছেন এই সাহসিনী। এখন তার একমাত্র লক্ষ্য দুই মেয়েকে পড়াশুনা শিখিয়ে খেলাধূলা শিখিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড় করানো। সংসার এবং জীবন দুক্ষেত্রের ব্যালেন্সের খেলাতে জয়ী প্রতিমা দেবী জানান, ‘মেয়েদের সবসময় শেখাই সৎ পথে থেকে জীবনের যে কোনো পরিস্থিতি মুখোমুখী দাঁড়াতে। কোনো পরিস্থিতিতেই যেনো ওরা ভঙে না পড়ে”। যেভাবে দায়িত্ব নিয়ে নিজের সংসার এবং মেয়েদের সামলান সেই একই রকম দায়িত্ব সহকারেও সামলান বাস প্যাসেঞ্জারদের। প্রতিমাদেবী জানিয়েছেন,

“আগে বহু প্যাসেঞ্জারই আমার বাসে উঠে নেমে যেতেন মহিলা ড্রাইভার দেখে। মহিলা ড্রাইভার দেখে তারা ভরসা পেতেন না। তবে এখন অনেকেরই মনোভাব বদলেছে। যদিও এখন মাঝেমধ্যে অনেকেই এরকম করেন, অনেকেই ফিসফিস করেন। আমি তাতে কান দিই না। আমার মাথার মধ্যে একটা কথাই চলে, আমার জীবনের চেয়েও আমার যাত্রীদের জীবনের দাম আমার কাছে অনেক বেশি। আমাকে দায়িত্ব নিয়ে সকলকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হবে”। বচর বিয়াল্লিশের প্রতিমা পোদ্দার দিনে হাওড়া নিমতা এবং নিমতা হাওড়া রুটের তিন থেকে চার ট্রিপ বাস চালান। এই মুহুর্তে মহানগর কলকাতার তিনিই একমাত্র মহিলা বাস ড্রাইভার। প্রতিমা দেবীর কঠিন চরিত্র, মেহনত করার মানসিকতা এওং সকলের প্রতি অমায়িক ব্যবহার এই রুটের অন্যান্য বাস ড্রাইভার থেকে শুরু করে কনডাক্টর সকলেরই মন জয় করে নিয়েছেন। তাদের কথায় , “ দিদি আমাদের গর্ব”। আর সকলের গর্ব ভালোবাসা নিয়েই শহর কলকাতার একমাত্র মহিলা ড্রাইভার প্রতিমা পোদ্দার চোয়াল শক্ত করে যাত্রীদের নিরাপদে পৌঁছনোর দৃঢ়তা নিয়ে প্রতিদিন বাসের স্টেয়ারিংয়ে বসেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: