লোকসভা নির্বাচনের আগে খরচ বাঁচাতে মরিয়া সিপিআই, বন্ধ হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহ্যবাহী ‘কালান্তর’ পত্রিকা

বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গাপুজোর আগে আগে দুঃসংবাদটা যে অপেক্ষা করছে, অনেকে তা আঁচই পাননি। আবার একটা আশঙ্কা বহুদিন ধরে থাকলেও, পত্রিকাটা অন্তত চলছিল। ফলে, এভাবে যে অন্ধকার নেমে আসবে ভাবতেও পারেননি ওই পত্রিকাতে হাতে খড়ি হওয়া বাঙলার বহু সাংবাদিক। শুধু কি সাংবাদিক? বহু প্রবীণ নাগরিক ও অগণিত সংবাদপত্রপ্রেমী মানুষের কাছে এই পত্রিকাটা শ্রেফ একটা কাগজ ছিল না। পার্টির মুখপত্র হিসেবে কোনও পাঠকই পত্রিকাটাকে দেখতেন না। বরং তাঁদের কাছে ওটা একটা সংবাদ আহরণ থেকে শুরু করে অবসরের সঙ্গী ছিল। প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় নিয়ম করে পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত হতো। আর তার চাহিদাও ছিল দারুণ। এরকম এক জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাকে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা আচমকাই নিয়ে ফেলল বামেদের প্রথম বড় শরিক – কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সিপিআই)।

ঐতিহ্যবাহী কালান্তর পত্রিকার ইতিহাস…

‘কালান্তর’ পত্রিকার জন্ম ১৯৬৫ সালে। সিপিআই পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিষদের এই মুখপত্র প্রথমে সাপ্তাহিক ছিল। তারপর ষাটের দশকের শেষের দিকে এসে দৈনিক পত্রিকা রূপে আত্মপ্রকাশ। কাগজের যে ‘মাস্টহেড’, মানে ‘কালান্তর’ লেখা ডিজাইনটি প্রখ্যাত বাঙালি, গল্পকার, চিত্রিশিল্পি এবং বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায়ের হাতেই তৈরি। ফলে, বাঙালার ঘরে ঘরে ‘কালান্তর’ পত্রিকার আবেগটা অন্য মাত্রায় ছিল। গ্রহণযোগ্যতাতেও ‘কালান্তর’ এক সময় অনেক বড় সংবাদপত্রকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে আসত। সোমনাথ লাহিড়ী, ভবাণী সেন, জ্যোতি দাশগুপ্ত, প্রভাত দাশগুপ্ত, অধ্যাপক গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের মতো বড় বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা এই পত্রিকার সম্পাদনা করে গিয়েছেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাকে অবশেষে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল সিপিআই রাজ্য পরিষদ। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে হওয়া রাজ্য পরিষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যা খবর, তাতে আগামী ৩০ অক্টোবর শেষ সংস্করণ প্রকাশিত হবে বাঙলার ঐতিহ্যবাহী এই পত্রিকার।

কারণ?

বামেদের প্রথম বড় শরিক সিপিআই অনেকদিন আগে থেকেই কোণঠাসা সংগঠনের মধ্যে। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসিস্ট) – সিপিআই(এম)’য়ের বড় শরিক হয়ে ওঠার কারণে অনেকদিন আগেই বাম সংগঠনে পিছনে সারিতে চলে গিয়েছে সিপিআই। সেইসঙ্গে তাদের মুখপত্র ‘কালান্তর’ও। যদিও ‘কালান্তর’ তার অস্বিস্ত বজায় রেখেছিল। এই পত্রিকাতে হাতে খড়ি হয়েছে বাংলার বহু সাংবাদিকের। তাদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত নাম। এরকম এক পত্রিকাকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো হাতে অর্থ নেই। খরচ সামলাতে পত্রিকা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পার্টির নেতাদের এই সিদ্ধান্তের ফলে পত্রিকার সত্তর জনের মতো কর্মী তাদের আয়ের উৎস হারাতে চলেছেন।

পত্রিকা চালানোর অনিচ্ছা…

২০১১ সালে বাংলার রাজনীতিতে পরিবর্তন আসার পর থেকে বাম সংগঠন ক্ষয়ীষ্ণু হয়ে পড়ার পর সিপিআই পার্টির অস্তিত্ব আরও বিপন্নের মুখে চলে যায়। তবে, কালান্তর পত্রিকাতে সময়োপযোগী করে তোলার ব্যাপারে ম্যানেজমেন্টের অনীহা বহুদিন আগে থেকেই শুরু। কর্মীদের স্বল্প বেতনে কাজ করানো, প্রিন্টিংয়ের গুনমানে আধুনিকতা না আনা, কালের নিয়মে প্রতিযোগিতার বাজারে পিছিয়ে পড়লেও সময় অনুপোযোগী সিদ্ধান্তে অনড় থাকা নিয়ে পত্রিকার কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ আগে থেকেই ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে বাংলার রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ার পর থেকে সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশনেও অনীহা লক্ষ্য করা গিয়েছে। তবে, এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা বন্ধের ব্যাপারে পার্টির মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব ছিল। সিপিআই রাজ্য কমিটির প্রাক্তন সম্পাদক মঞ্জু কুমার মজুমদার, শ্রমিক নেতা দেবাশিস দত্ত, প্রবীর দেবের মতো ব্যক্তিরা পার্টির ভাবাদর্শ ও আবেগের কথা ভেবে ‘কালান্তর’ পত্রিকা বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেও, পার্টির একটা বড় অংশের বক্তব্য, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে খরচ সামলাতে হবে। ফলে, তারা বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরতে চাইছেন না।

কালান্তর কর্মীদের ক্ষোভ…

দলের ভিতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব, কালের নিয়মে যুগবিমুখী হয়ে পড়ায় আর্থিক দৈনতা ‘কালান্তর’-এর পথযাত্রী অনেকদিন ধরেই। নন্দগোপাল ভট্টাচার্যের মৃত্যুর পর থেকে ম্যানেজমেন্ট কোনওদিনই এই পত্রিকার উন্নতিতে চেষ্টা চালায়নি। বরং পত্রিকা বন্ধ করে দিতেই চাইছিল। এই নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভও ছিল। প্রবীণ নেতাদের বিরোধিতাতেই এতোদিন এই পত্রিকা বন্ধ হয়নি। কিন্তু, লোকসভা নির্বাচনে খরচের কথা প্রশ্নে তাঁরাও পিছু হটলেন।

‘কালান্তর’ পত্রিকায় এককালে দীর্ঘসময় ক্রীড়া সম্পাদকের দায়িত্ব সামলানো এক বিশিষ্ট সাংবাদিক পত্রিকা বন্ধ হতে চলা প্রসঙ্গে চাঁচাছোলা ভাষায় সমালোচনা করেছেন –

”পত্রিকার ম্যানেজমেন্ট যেমন অপদার্থ, তেমনই পার্টির অবস্থা বাংলার রাজনীতিতে ক্ষয়ীষ্ণু। নেতাদের চরম গাফিলতি এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার কারণে শেষ হয়ে গেলো এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা।”

তবে, দুর্গাপূজোর আগে আগে এই পত্রিকা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখানে একনিষ্ঠভাবে জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত করে দেওয়া পত্রিকার কর্মচারী ও তাদের পরিবারে একরাশ অন্ধকার নেমে এলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: