ভারতের দশটি ধনী মন্দির, যার সম্পদ ঘুরিয়ে দেবে আপনার মাথাও

ভারতের যে কোনো এলাকাতেই যাওয়া যাক কেনো একটা না একটা হিন্দু মন্দির চোখে পড়বেই। মন্দির হিন্দুদের জন্য খুবই পবিত্র জায়গা। আপনি আপনার ভাবনা, কাজ বা শব্দ দিয়ে এই জায়গাটি দূষিত করার সাহস দেখাতে পারবেন না। অধিকাংশ মন্দির সেই মন্দির দেখভালের জন্য বানানো ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। ভক্তদের কাছ থেকে ডোনেশন সংগ্রহ করা হয় এবং এবং ডোনেশন বাক্সটি পরিকল্পনা মাফিকই মূর্তির সামনে রাখা হয়ে থাকে। বেশি কিছু মন্দির অন্যদের থেকে অনেক বেশি ডোনেশন নিয়ে থাকে। আজ আমরা এখানে এমন দশটি মন্দিরের কথা বলব যা ভারতের সবথেকে ধনী মন্দির হিসেবে পরিচিত। এটা শুনলে হয়ত বিশ্বাস করা কঠিন হবে কিন্তু কিছু মন্দিরের এত টাকা আছে যা ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির থেকেও বেশি। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের কথা, যার সম্পদের মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলার, যা মুকেশ আম্বানির মোট সম্পত্তির থেকেও বেশি। এবং এটা ভারত তথা বিশ্বের ধনী মন্দিরগুলির একটি।

 

১০ শবরীমালা মন্দির , পেরিয়ার টাইগার রিজার্ভ

শবরীমালা মন্দির কেরালার পেরিয়ার টাইগার রির্জার্ভে অবস্থিত, এটি পরিচত সারা বছর ধরে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থীদের আগমনের জন্য এবং যারা কোটি কোটি টাকা প্রদান করেন তাদের প্রিয় ভগবানের উদ্দেশ্যে। ২০১৩য় এই মন্দিরের ডোনেশনের অ্যামাউন্ট ছিল ২০৩ কোটি টাকা। শবরীমালার মোট আয়ের মধ্যে খালি আরাধনার প্রসাদের মুল্যই দাঁড়ায় ৭৪.50 কোটি টাকা। পাথানামথিট্টা জেলার সৌন্দর্য এবং সুন্দর পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই মন্দিরে বছরে প্রায় ১০০ মিলিয়ন দর্শনার্থীদের সমাগম হয়। এই তীর্থ যাত্রার আগে ভক্তরা ৪১ দিনের উপোসের মানত করেন। এই সময়ের মধ্যে ভক্তরা নন ভেজিটেরিয়ান খাবার ( ডেয়ারি ছেড়ে), মদ, তামাক, এমনকী সহবাস থেকেও নিজেদের দূরে রাখেন। এটা ভেতর থেকে মনকে পরিস্কার রাখা নিশ্চিত করে। এখানে আপনি পাবেন দশটি মন্দির যা মূল মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ কোনো কিছুই বেচেন না বরং আশির্বাদের উপর নির্ভর করে সুন্দর জীবন কাটান।  এই সমস্ত মন্দিরের ম্যানেজিং অথোরিটি প্রত্যেকদিন হাজার হাজার ভক্তদের  সুন্দরভাবে সামলান এবং এবং সমস্ত টাকাই তারা ভালো কাজে দান করেন।

 

৯ অমরনাথ গুহা, অনন্ত নাগ

 

প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষেরও বেশি মানুষ দক্ষিণ কাশ্মীরের হিমালয়ে অমরনাথ গুহায় ভগবান শিবের পবিত্র বরফের লিঙ্গে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার জন্য পাহাড়ি পথে যাত্রা করেন। যে কোনো সুন্দর কারুকার্য করা পিলার বা গম্বুজ ছাড়াই এই তীর্থযাত্রা প্রমান করে যে এই যাত্রা এক মাত্র ভগবানের প্রতি বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল আর কোনো কিছুরই উপরেই নয়, যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে জুলাই আগস্ট মাসে এই যাত্রায় আকর্ষিত করে।

 

৮ কাশী বিশ্বনাথের মন্দির, বেনারস

বিশ্বনাথ এই মন্দিরের প্রধান দেবতা। যার মানে পুরো বিশ্বের শাসন কর্তা। এবং এই মন্দির নিশ্চিতভাবেই তার নামের উপরেই রয়েছে। দুটি সোনার পাতে মোড়া গম্বুজ, বার্ষিক ডোনেশন ৬ কোটিরও বেশি, ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট গনেশ গুপ্তাদের মত ভক্তের জন্যই এই মন্দির বিশ্বের ধনীতম মন্দিরের তালিকায় দৃঢ়তার সঙ্গেই স্থান পেয়েছে।

 

৭ জগন্নাথ মন্দির, পুরী

এই মন্দির উৎসর্গী কৃত পুরীর ভগবান জগন্নাথ দেবের নামে, এছাড়াও এই মন্দির পরিচত দরিদ্র্য নারায়ন নামেও। এই মন্দিরের সম্পদের মূল্য ২৫০ কোটি টাকা এবং এর বার্ষিক আয় ৫০ কোটি টাকা। বারশো শতক থেকে অন্তত ১৮ বার এই মন্দিরে হামলা হয়েছে তার সম্পদের জন্য যার ১২টি চেম্বার রয়েছে যার মধ্যে এই মন্দির কর্তৃপক্ষ খোলেন মাত্র দুটি। যদিও এই মন্দিরের স্বর্ণ সম্পদের কোনো এস্টিমেট করা যায় নি। তবে এটা সকলেই জানেন যে স্বর্ণবেশ সমারোহের সময় এই মন্দিরের দেবতাদের ২০৯ কেজি সোনা দিয়ে সাজানো হয়।

 

৬ মীনাক্ষী মন্দির মাদুরাই

মীনাক্ষী মন্দির অবস্থিত মন্দির শহর বলে পরিচিত মাদুরাইতে। এই মন্দিরের চারপাশে বহু অন্য মন্দির থাকা সত্ত্বেও এই মন্দিরে তবু এখনও প্রতিদিন প্রায় ২০০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম হয়। ১৪ শতকে এই মন্দির দুষ্ট মোগল রাজা মালিক কাফুর দ্বারা লুন্ঠিত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও এই মন্দির তার অতীতের সমস্যা কাটিয়ে এখনও লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ১০ দিনের বার্ষিক মীনাক্ষী তিরুকল্যানম উৎসবের সময় এই বিশাল মন্দিরে প্রায় এক মিলিয়ন দর্শনার্থীর সমাগম হয়। যা উদযাপিত হয় এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে। এবং ধনিরা এই মন্দিরে প্রতিবছর আয় হয় ৬ কোটি টাকা অথবা ৬০ মিলিয়ন টাকা।

 

৫ সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির, মুম্বাই

এই সিদ্ধিদাতা গনেশের মন্দির যে কোনো মুম্বাইবাসির কাছেই একমাত্র জায়গা, যেখানে তারা তাদের জীবনের বড়ো কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে যান। সম্প্রতি এই মন্দিরে এসেছিলেন অ্যাপেলের সিইও টিম কুক, এবং এই মন্দিরের বিশ্ব জুড়ে ভক্ত রয়েছে। এই বিশাল জনপ্রিয়তার কারণেই এখানে বহু মানুষের পা পড়ার পাশাপাশি বহু ডোনেশনও আসে। গনেশে মুখ্য মন্দিরের উপরের গম্বুজটি ৩.7 কেজি সোনা দিয়ে মোড়া। ১০০ কোটির বার্ষিক আয় এবং ১২৫ কোটির ফিক্সড ডিপোজিটের কারণে এই মন্দির সহজেই ভারতের ধনী মন্দির গুলির একটি।

 

৪ বৈষ্ণদেবী মন্দির,

জম্মু ডিস্ট্রিক্টের কাটরায় অবস্থিত এই মন্দির, লোক সমাগমের দিক থেকে তিরুপরতি মন্দিরের পরেই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় স্থান। ৫,২০০ ফুট উঁচু ত্রিকূট ভগবতী পাহাড়ের একটি গুহায় এই মন্দিরটি অবস্থিত। বহু ভক্তদের আগমন বাড়তে থাকায় শেষ কয়েক বছর ধরে এই মন্দিরের রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মন্দিরের বার্ষিক আয় বর্তমানে ৫০০ কোটি টাকা।

 

৩ সাঁই বাবা মন্দির, শিরডি

উদার সন্নাসী সাঁই বাবা যিনি ১৮ শতকে বসবাস করতেন, ভারতে তার বিশ্বজোড়া আকর্ষণ রয়েছে। সমস্ত ধর্মের এবং জীবনের মানুষেরই তাঁর প্রতি বিশ্বাস রয়েছে। অন্য দেবতাদের বিপরীত যারা কেবল প্রাচীন পৌরানিক কথার মধ্যেই জীবিত রয়েছেন, সাঁই বাবা হিন্দু ধর্মের একমাত্র চরিত্র যার ছবি রয়েছে।  যিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসবাস করতেন, ছেঁড়া কাফনি পড়তেন, বিশ্রামের সময় ইঁটে মাথা দিয়ে ছেড়া মাদুরে শুতেন, খাবারের জন্য ভিক্ষে করতেন সেই সাঁই বাবার প্রতিমা বসা রয়েছে দুই ভক্তের দ্বারা দান করা ৯৪ কেজি সোনার সিংহাসনে যার মূল্য ১০০ কোটি টাকা।

 

২ ভেঙ্কটেশ্বর মন্দির, তিরুপতি

ভেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার থেকে ১০০ হাজার লোকের সমাগম হয়। এবং বিশেষ উৎসব এবং অনুষ্ঠানে প্রায় ৫০০ হাজারেরও বেশি শুট হয়। এত বেশি ভক্তের প্রতিদিন শ্রদ্ধার কারণে এখানে নিশ্চিতভাবেই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এই মন্দিরে বিশাল পরিমাণে ডোনেশন জমা পড়ে। তিরুমালা মন্দিরে একটি সোনার ভান্ডার রয়েছে, এবং ৫২ টনের সোনার অলঙ্কার রয়েছে (যার মধ্যে রয়েছে ১০০০ বছর ধরে বিভিন্ন রাজাদের দেওয়া এমনকী বৃটিশ শাসকদের দেওয়া দেবতাদের মূর্তির জাহাজ)। সাম্প্রতিক হিসেবে অনুযায়ী যার মূল্য ৩৭,০০০ কোটি টাকা। প্রত্যেক বছর ভক্তদের দেওয়া হুন্ডি/ ডোনেশন ৩০০০ কেজি সোনায় পরিবর্তিত হয়ে যায়, এবং এই সোনার ভান্ডার জমা হয়ে যায় রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কে।

 

১ পদ্মনাভস্বামী মন্দির, তিরুবনন্তপুরম

পদ্মনাভস্বামী মন্দির না শুধু ভারতের বরং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মন্দির গুলির একটি। ত্রিভেন্দ্রামের সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দির গুলির একটি এটি। কেরালার রাজধানি হল তিরুবনন্তপুরম, যা পরিচিত তার বিখ্যাত এবং আরামদায়ক বোট রাইডিংয়ের জন্য। এই মন্দিরটি দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্য শৈলীতে তৈরি, যা দক্ষিণ ভারতে বহুল প্রচলিত এবং মন্দিরটি ভগবান বিষ্ণুর নামে উৎসর্গীকৃত। মন্দিরের ভেতরের সিন্দুকটি যা সম্প্রতিই খোলা হয়েছিল, সোনা রূপো এবং হিরে দিয়ে ঠাসা অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। বেশ কিছু মানুষ এই সম্পদের মূল্যায়ন করেছেন ১ ট্রিলিয়ন ডলার। যা এই মন্দিরকে বিশ্বের অন্যসব মন্দিরের থেকে অনেকটাই এগিয়ে রাখে। এবং খুব কমই সুযোগ রয়েছে যে আর কোনো মন্দির তার সম্পদের পরিমান এই মন্দিরের সম্পদের সঙ্গে তুলনা করতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: