এক বাঙালির স্বপ্নের উত্থান, দীর্ঘ যাত্রা পথে সঙ্গী আশি লক্ষ মহিলার আর্শীবাদ!

১৯৬০ সালের কথা। ত্রিপুরার রামচন্দ্রপুর গ্রামে এক মিষ্টি বিক্রেতার ঘরে জন্ম হয় এক ছেলের। কে জানত সে বাঙালিই একদিন বদলে দেবেন আশি লক্ষ মহিলার ভবিষ্যৎ। আর তাঁদের আশীর্বাদ আর শুভকামনাকে সঙ্গে নিয়ে বদলে দেবেন দেশের ব্যাঙ্কিং সেক্টরের ভবিষ্যৎ। সত্যি…অদম্য সাহস আর মনে অসীম জেদ থাকলে, কি না হয়। চন্দ্র শেখর ঘোষের হাতে তৈরি কোম্পানি আজ দেশের প্রথম মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থা যাকে ব্যাঙ্কিং লাইসেন্স দিয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। কোনও ঠগবাজি নয়, অগণিত মহিলার বিশ্বাসের এক নাম বন্ধন ব্যাঙ্ক।

চন্দ্র শেখর এমন এক পরিবারে জন্মেছিলেন, যেখানে খুব কাছ থেকে গরিবী কে তিনি দেখেছিলেন। তাঁদের পরিবারের মোট পনেরজন সদস্য ছিল সে সময়। ওর মধ্যে বাবা ও মা’কে নিয়ে তাঁদের মোট সদস্য ওর মধ্যে ছিল ন’জনের। সাত ভাইয়ের মধ্যে চন্দ্রশেখর সবচেয়ে ছোটো। মিষ্টির দোকান চালিয়ে বাবা যা রোজগার করতেন, তাতে কোনওভাবে চলত সংসার। পেট ভরে এলাহি করে খাওয়াটাও জুটত না। তৎকালীন গ্রেটার ত্রিপুরাতে বারো ক্লাস পর্যন্ত পড়াশোনা চালানোর পর বাংলাদেশে চলে যান চন্দ্র শেখর। ১৯৭৮ সালের কথা। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ট্যাটিসটিক্স নিয়ে পড়াশোনা আর মাস্টার্স ডিগ্রি করা। পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য টিউশনও দিতেন চন্দ্র। আর বাদবাকি থাকা খাওয়ার খরচটা সামলে দিতেন বাবার এক পরিচিত। নাম ব্রজনন্দ স্বরস্বতী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আশ্রম চালাতেন একটা।

১৯৮৫ সাল থেকে ভাগ্য বদলানো শুরু। ব্রাক নামে একটি এনজিও’তে যোগ দেন। সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ১৯৯৭ সালে কলকাতা চলে আসেন চন্দ্র। এরপর ১৯৯৮ সালে আরও একটি বেসরকারি অলাভজনক সংস্থায় যোগ দেন। পড়াশোনা চালানোর সময় টিউশন দিয়ে প্রথম রোজগার পঞ্চাশ টাকা। সেটা থেকে টাকা বাঁচিয়ে বাবার জন্য একটি জামা কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন চন্দ্র। তাঁর বাবা সেটা না নিয়ে বলেন, জামাটা তাঁর কাকাকে দিয়ে দিতে। বাবার ওই মতাদর্শই চন্দ্র শেখরকে অন্যের জন্য বাঁচার প্রাথমিক শিক্ষাটা দেয়। কলকাতায় আসার পর দরিদ্র বাঙালি মহিলাদের উন্নয়ন নিয়েই কাজ করতেন আপামর ভদ্রলোক চন্দ্র শেখর ঘোষ। ২০০১ সালে সেই থেকেই মহিলাদের কল্যাণের জন্য মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাঙ্ক খোলেন। মাত্র দু’লক্ষ টাকা নিয়ে স্বপ্নের যাত্রা শুরু। পরিবারের লোকেরা হাজার আপত্তি করা সত্ত্বেও স্বপ্নের পথ ছাড়েননি। অদম্য সাহস আর মনের জোর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দরিদ্র পরিবারের মহিলাদের উপকারের জন্য। যে স্বল্প পুঁজি নিয়ে কোম্পানি শুরু, সেটাও আত্মীয়-পরিজনদের কাছ থেকে ধার হিসেবে নিয়েছিলেন।

চন্দ্র শেখর ঘোষের বক্তব্য ছিল, মহিলারা তখনই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন, যখন তাঁদের পাশে আর্থিক সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানো যাবে। আর যেহেতু ওপার বাংলা ও এপার বাংলার মহিলারা বেশিরভাগ অশিক্ষার অন্ধকারে পড়ে রয়েছেন, তাই তাঁদের ঠকাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেন না অসাধু ব্যবসায়ীরা। মহিলাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে নিজের চাকরি ছেড়ে দেন চন্দ্র। কিন্তু, মা, বউ আর ছেলের মুখে অন্নও তো তুলে দিতে হবে। হাতে যে সম্বল ছিল, সেটাও কাজে লাগাতে পারছিলেন না। এই অবস্থায় তাঁর এক ভাই তাঁকে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা ধার দেন। আর বাকি ৩৫ হাজার টাকা এক মহাজনের কাছ থেকে ধার নেন চন্দ্র। এইভাবেই পথ চলা শুরু।

২০০১ সালের জুলাই মাসে কোন্নগরে প্রথম শাখা খোলা হয় বন্ধনের। তারপরের বছর ২০০২ সালে স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসআইডিবিআই) ২০ লক্ষ টাকা লোন দেয় বন্ধন-কোন্নগর মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থাকে। প্রথম দিকে মহিলাদের লোন নেওয়ার জন্য রাজি করাতে, বাংলার নানান জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। মহিলারা অনেক সময় তাঁকে সন্দেহের চোখেও দেখেছেন, যে হঠাৎ একটা লোক এসে এভাবে টাকা ধাল দিতে চাইছে কেন তাঁদের! কিন্তু, সৎ উদ্দেশ্য কখনও বিফলে যায় না। আজ পর্যন্ত বন্ধন ব্যাঙ্ক আশি লক্ষেরও বেশি মহিলার জীবনে আলো এনেছে। ২০১৩ সালে ইউভার্সাল ব্যাঙ্কিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে বন্ধন। ২০০৯ সালেই নন-ব্যাঙ্কিং ফাইন্যান্স কোম্পানি হিসেবে আরবিআই’য়ের কাছে তাঁর সংস্থাকে নথিভুক্ত করিয়েছিলেন চন্দ্র শেখর। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর বন্ধন মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থা বন্ধন ফিনান্সিয়াল হোল্ডিংসে পরিণত হয়। তার আগেই এপ্রিলে আরবিআই চন্দ্র’র সংস্থাকে ব্যাঙ্কিং লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেয়। ২০১৫ সালের ১৭ জুন থেকে পুরোপুরিভাবে ব্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করছে বন্ধন। ওই বছর ২৩ অগস্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরুণ জেটলি কলকাতায় বন্ধনের নতুন অফিসের উদ্বোধন করেন। মাইক্রো ব্যাঙ্কিং আর জেনেরাল ব্যাঙ্কিং – দু’টি শাখাই চালু রয়েছে বন্ধন ব্যাঙ্কের। দারিদ্র দূরিকরণের পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে ছোটো বাচ্চাদের বিনামূল্যে শিক্ষার নানা কর্মসূচিও হাতে নিয়েছে চন্দ্র শেখরের বন্ধন ব্যাঙ্ক।

বন্ধন ব্যাঙ্ক শেয়ার বাজারে নাম নথিভুক্ত হওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই ইয়েস ব্যাঙ্কের খুব কাছে চলে এসেছে। শেয়ার সংখ্যা ৮৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আইপিও বেড়ে ৩৭৫ টাকার মাত্রা ছাড়িয়েছে। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ব্যাঙ্কের সেরা দশের তালিকায় আট নম্বরে রয়েছে চন্দ্র শেখর ঘোষের বন্ধন ব্যাঙ্ক। বন্ধন নামটি চন্দ্র দেওয়ার কারণ, দেশের মহিলাদের বিশ্বাস ও মানুষের সঙ্গে মনের যোগাযোগ বোঝাতে। মাত্র দু’লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করে বন্ধন ব্যাঙ্কের আজ মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন ৮৩ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। শেয়ার বাজারে বন্ধন ব্যাঙ্কের প্রাইস টু বুক ট্রেডিং ভ্যালু ৮.৯। মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের হিসেবে সেরা দশের তালিকায় শীর্ষে থাকা এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের ট্রেডিং ভ্যালু সেখানে ৫.১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: