অভুক্ত শিশুদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার নজীরবিহীন প্রচেষ্টা এক শিক্ষকের

আমাদের চারপাশে রোজই আমরা দেখতে পাই এমন অনেক মানুষকে যারা খেতে পান না। এই সমস্ত মুখগুলোকে দেখা যায় নামি দামি রেস্তোরার সামনে কিংবা রাস্তার দোকানের আশেপাশে ঘুর ঘুর করতে। যদি কোনো সহৃদয় মানুষ দয়া করে খেতে দিলে তারা খেতে পায় অন্যথায় থাকতে হয় অভুক্ত। এইরকম বহু অভুক্ত মানুষকেই আমরা রোজ দেখি রাস্তাঘাটে আমাদের আশেপাশে। অন্যদিকে আমাদের বাড়িসহ বিভিন্ন দোকানে রেস্তোরায় হোটেলে অপচয় হয় বহু খাবার। যদি সেইসমস্ত খাবার তুলে দেওয়া যেত এই সব অভুক্ত মানুষের মুখে! তেমনই কাজ করে চলেছেন একজন মানুষ।

কেমনভাবে একবার জেনে  নেওয়া যাক। তিনি চন্দ্রশেখর কুন্ডু, আসানসোলের কম্পিউটার সায়ন্সের এক শিক্ষক। এইসব অভুক্ত গরীব মানুষগুলোর কাছে তিনি দেবদূত। বিভিন্ন রেস্তোরা, অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে বাড়তি খাবার রোজ সংগ্রহ করেন তিনি, আর তুলে দেন অভুক্ত গরবী শিশুদের মধ্যে। তার এই অসামান্য প্রয়াসে সাধুবাদ জানায় সকলেই, কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই এই শিক্ষকের। তিনিই পথ দেখিয়েছে এই ভাবে বাড়তি খাবার নষ্ট না করে কিভাবে তুলে দেওয়া যায় অভুক্তদের মুখে। যা প্রায় অবিশ্বাস্য। এখনও পর্যন্ত চন্দ্রশেখর বাবু মোট এক লক্ষ্য প্লেটেরও বেশি খাবার বাঁচিয়েছে অভুক্তদের মুখে তুলে দেওয়ার অনন্য নজিরও গড়েছেন।

তার ঐকান্তিক একক প্রচেষ্টার কলকাতার বালিগঞ্জ, গড়িয়াহাট, এবং আসানসোলের প্রায় ১০০ জন পথ শিশু খাবার পায়। চন্দ্রশেখর বাবুর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বহু মানুষ এমনকী বহু রেস্তোরাও। তারই উদ্যোগে ওইসব অভুক্ত শিশুদের আর অভুক্ত থাকতে হয় না। আমাদের বাড়িতে আরও অন্যান্য হোটেল খাবারের দোকানে যে পরিমান খাবার নষ্ট হয় তা দিয়ে বহু মানুষেরই পেট ভরানো যায়। তাই খাবার নষ্ট না করে আপনিও সামিল হতে পারেন এই প্রকল্পে। এ ব্যাপারে চন্দ্রশেখর বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “পৃথিবীতে প্রতি ৫ সেকেন্ডে একজন করে শিশুর মৃত্যু হয় অনাহারে। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়। সকলেই যদি অল্প অল্প করে এগিয়ে আসেন তাহলে কমতে পারে এই মৃত্যুর হার”।

আসানসোল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কম্পিউটার সায়েন্সের এই শিক্ষক তার ছাত্র এবং পরিচিত কিছু মানুষের সাহায্যে গড়ে তুলেছেন সেভ ফুড অ্যান্ড সেভ লাইফ নামে একটি সংস্থা। কিভাবে তিনি এই কাজে ব্রতী হলেন? চন্দ্রশেখর বাবু জানান, ২০১৫ সালে তার ছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া অতিরিক্ত খাবার ফেলে দেওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে দেখতে পান দুটি শিশু ডাস্টবিনের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে খাবারের জন্য। ওইভাবে শিশু দুটিকে কাঁদতে দেখা তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তার ফেলে দেওয়া খাবার এই দুটি শিশুর খিদে মেটাতে পারত। আর এই ভাবনা থেকেই তিনি এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন। আর এই কাজ শুরু করার আগে তিনি প্রথম তার কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে স্টপ ফুড ওয়েস্টেজ নামে একটি ডকুমেন্টারি ছবি তৈরি করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল কলেজ ক্যাম্পাসের খাবারের অপচয় বন্ধ করা এবং এ বিষয়ে অন্যান্যদের সচেতন করা। অচিরেই সাফল্য পান তিনি। ওই ডকুমেন্টারিটি বহুল জনপ্রিয় হয় এবং সেখানকার খাবারের অপচয় অনেকটাই কমে যায়।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে তিনি জাতি সংঘের একটি রিপোর্ট তুলে ধরেন। সেই রিপোর্ট অনুসারে ভারতের প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ্য মানুষ অপুষ্টিতে ভোগেন। অন্যদিকে ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ায় প্রচুর পরিমাণে খাদ্য শস্য নষ্ট হয়। ঠিক কত পরিমান খাদ্য শস্য নষ্ট হয় এফসিআইতে তা জানতে তিনি ২০১৬য় তথ্য জানার আইনে আরটিআই করেন এফসিআইয়ের কাছে। ওই আরটিআইয়ের জবাবে এফসিআই জানায় গত দু’বছরে ২২ হাজার কোটি মেট্রিক টন খাদ্য শস্য নষ্ট হয়েছে, ওই খাদ্য শস্য দিয়ে এক মাস যাবত এক লক্ষ্য শিশুর মুখে মধ্যাহ্ন ভোজন তুলে দেওয়া যেত। এরপর চন্দ্রশেখর বাবু তার ছাত্রদের নিয়ে এলাকার বিভিন্ন হোটেলে যোগাযোগ করেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহের কাজে মন দেন তিনি। আর তা দিয়েই অভুক্ত শিশুদের মুখে খাদ্য তুলে দেন তিনি। সেই ছবি ভাইরাল হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। হাত বাড়িয়ে দেন আরও বহু মানুষ। এরপরই চন্দ্রশেখর বাবু গড়ে তোলেন ফুড এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভলপমেন্ট নামের একটি সংস্থা।

এই সংস্থার ১৩৫ জন ছাত্র, শিক্ষক, সমাজকর্মী মিলে বিভিন্ন অফিস, ক্যান্টিন, হোস্টেল, পুলিশ এবং সিআইএসএফ ব্যারাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন যেখানে প্রায় প্রতিদিনই বহু খাবার নষ্ট হয়। বিভিন্ন ক্যান্টিন মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও চলে সেখান থেকে খাদ্য সংগ্রহের কাজ ও বিতরণ। চন্দ্রশেখর বাবু জানান, “ আমরা ছাত্রদের বেছে নিয়েছিলাম স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে। তাদেরকে অনুপ্রানিত করেছিলাম এই কাজে। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা যাতে খাবার ভালো আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য প্রশিক্ষনও দিয়েছি। সেখানে বিভিন্ন শেফ তাদের এই প্রশিক্ষণ দেন”। এই মুহুর্তে চন্দ্রশেখবর বাবুর সংস্থা এফইইডিতে রয়েছে ১৬৫ জন মানুষ। এরমধ্যে ৭০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রতিদিন কলকাতাসহ আসানসোলের ১৫০ বাচ্ছার প্রতিদিনের খাবার যোগান দেওয়ার ব্যবস্থার কাজে যুক্ত।

এই সংস্থার রয়েছে একটি হট হেলপ লাইনও। যারা অতিরিক্ত খাবার নষ্ট না করে এই সংস্থাকে দিতে চান যোগাযোগ করতে পারেন তারা। তাদের সংস্থা ফিড গড়িয়াহাটে তাদের নতুন প্রকল্পও চালু করেছেন। নাম ফুড ফর গুড। এখানে রয়েছে একটি ফুড র‍্যাক যেখানে সাধারণ মানুষ প্যাকেটজাত নুডলস, কেক, বিস্কুট, জ্যাম, এবং ফলের মত অতিরিক্ত খাবার পাঠাতে পারেন। এছাড়াও তাদের ভাবনায় রয়েছে সারা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় আরও ১০টি এই ধরনের ফুড র‍্যাক তৈরি করার। চন্দ্রশেখবর বাবুর সংস্থা ফিড একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনও চালু করেছে যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কোন জায়গায় অতিরিক্ত খাদ্য জমা দেবে তা জানতে পারবে। এছাড়াও ফিড আসানাসোলে তৈরি করেছে একটি স্কুল এবং লাইব্রেরী। তাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ঝাড়খন্ড এবং বিহারের মত পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে কাজ করার। এই প্রতিষ্ঠানটি গরীব শিশুদের জন্য সপ্তাহান্তে চালায় একটি স্কুল এবং নাচের স্কুল। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইলে ফোন করতে পারেন এই সংস্থার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে ৯৪৩৪২২৬৪০৩। এছাড়াও সরাসরি চন্দ্রশেখর বাবুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন ৯৬৪৭৬২৭৬১৬ এই নাম্বারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: