স্কুলের উন্নয়নে জমানো পুঁজি অনুদান প্রধান শিক্ষকের, পারবেন এমন উদার হতে?

ভালো করে পড়াশোনার করার পিছনে একটাই তাগিদ থাকে, শিক্ষার্থী জীবন শেষ করে ভালো একটা চাকরি করার। তরুণ বয়স এই চাকরির পিছনে ছুটতে ছুটতে কবে যে বার্ধক্যে ঢলে পড়ে, তার হিসেবও থাকে না। সময় বড় চঞ্চল। তাকে এক জায়গায় ধরে রাখা মুশকিল। চোখের পলকেই অতিবাহিত বেশ কয়েকটা বছর, আবার কখনও বেশ কয়েকটা দশক। চাকরি জীবন শেষ করে অবসর সবাইকে একদিন নিতেই হয়। আর অবসর জীবনাটা যাতে ঠিকঠাকভাবে কাটে, তার জন্যই চাকরি জীবনে সবাই কিছু সম্পদ গচ্ছিত রাখেন।

চাকিরর জীবনের মতো অবসর জীবনে সেভাবে হাতে টাকা আসে না। যাঁরা সরকারি চাকুরে তাঁরা পেনশন পেলেও, মাইনের টাকা অর্ধেক। আর তার চেয়ে বড় কথা, মানুষটি যদি শিক্ষক হয়, তাহলে তাঁর কষ্টের শেষ নেই। কারণ, এদেশে যাঁরা মানুষ গড়ার কারিগর তাঁরাই অভাবী। ফলে, চাকরি জীবনে জমানো টাকা অনেকাংশেই তাঁদের কাছে বোনাস সমান। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকার মূল্য কয়েক লক্ষ টাকার সমান। অথচ আমাদের পশ্চিমবঙ্গেরই গ্রামের এক শিক্ষক ওই পরিমাণ অর্থ নির্দ্বিধায় দান করে দিলেন।

পোলবার সুগন্ধা গ্রাম পঞ্চায়েত। সেখানকার পাঁচরিকরের বাসিন্দা অখিলেশবাবু। তাঁর মা পঙ্কজীনী দেবী খুব অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে ছেলেকে বড় করেছিলেন তিলে তিলে। অখিলেশবাবু সেসব দিনগুলির কথা এখনও মনে রেখেছেন। অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও শিক্ষাগ্রহণ করেন। অখিলেশবাবুর মা আর পাঁচটা মায়ের মতো ছেলের একটা চাকরি জন্য ভগবানের কাছে নিত্যদিন প্রার্থনা করতেন। চাকরি জীবন একদিন এলো। ছেলে স্কুলে শিক্ষকের চাকরি পাওয়ায়, মা খুব খুশি হন। চেয়েছিলেন, ভগবান তার প্রার্থনার মুখ রেখেছেন বলে, ছেলে যেন খরচ করে মন্দির তৈরি করেন। কিন্তু, শিক্ষকতার পেশায় যোগ দেওয়া অখিলেশবাবু স্কুলকেই মন্দির বলে মনে করেন। মাকে বোঝান, মন্দির নয়, স্কুলের উন্নয়নের জন্য তাঁর ইচ্ছেমতো অর্থই দান করবেন। মাকে দেওয়া সেই কথা মতোই অবসরের দিন যে স্কুলে দীর্ঘ তিরিশ বছর চাকরি করেছেন, প্রধান শিক্ষক হয়েছেন, সেই নিম্ন বুনিয়াদী প্রাথমিক স্কুলকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করেন অখিলেশবাবু।

নিজের স্কুলকে খুব ভালোবাসসেন অখিলেশবাবু। আর স্কুলের পড়ুয়ারাও তাঁকে একইরকম ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিপাট ভদ্রোলক মানুষটাকে এতোটাই শ্রদ্ধার চোখে দেখেন ওই স্কুলের প্রাক্তন পড়ুয়ারা যে অবসর দিন সবাই হাজির প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানাতে। বিদায়পর্বে চোখে জল সমস্ত পড়ুয়াদের। মাস্টারমশাই যে অবসর নিচ্ছেন। সেই সঙ্গে স্কুলের উন্নয়নের জন্য নিজের সামান্য ইচ্ছে পূরণ বা অবসরের দিনের কথা না ভেবে, মাকে কথা দিয়েছিলেন বলে জমানো ওই টাকা অনুদান দিয়ে যান। করতালি আর রবীন্দ্র সঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে প্রিয় প্রধান শিক্ষককে বিদায় জানানোর মধ্যে বিষ্ণতা থাকলেও, কোথাও যেন একটা খুশির ছোঁয়া। না…মনুষ্যত্ব এখনও আছে আর অখিলেশবাবুর মতো মানুষ গড়ার কারিগররাও! ওঁরা যে শিক্ষক। পথ দেখানোই ওনাদের কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: