বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ১০ রকমের সামরিক হেলিকপ্টারের মধ্যে একটি ভারতীয় সেনার হাতেও আছে

হেলিকপ্টার। ছোট্টো একটি শব্দে বেশ কৌতূহল আমাদের। আকাশে উড়তে দেখলে, আমরা যারা শহরে থাকি, তারাও ছাদে উঠে, না হলে বাড়ির বারান্দা দিয়ে উঁকি মেরে আকাশের দিকে তাকাই। প্লেনে ওঠার শখ যাঁদের, অনেকেই সেটা সহজে পূরণ করে নিতে পারেন। কিন্তু হেলিকপ্টারে চড়ার শখ পূরণ করাটা অতো সহজলভ্য নয়। কারণ, বাণিজ্যিকভাবে এটাকে ব্যবহার করা হয় না। পাহাড়ি অঞ্চলে কোনও কোনও জায়গা প্যাকেজে পরিষেবা দেওয়া চালু থাকলেও, কিন্তু, তা বিপুল ব্যয়সাধ্য।

ইংরেজিতে হেলিকপ্টার শব্দটি এসেছে ফরাসী শব্দ হেলিকপতেরে থেকে। ১৮৬১ সালে গুস্তাভ পন্তন ডি’অ্যামেকোর্ট শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি আবার এই শব্দটি তৈরি করেছিলেন গ্রিক শব্দ হিলিক্স (এর মানে চক্রাকার) এবং তেরন (এর মানে ডানা) থেকে। ইংরেজি ভাষায় হেলিকপ্টারের আরও অনেক নাম আছে, যেমন- চপার, কপ্টার, হেলি, হোয়ার্লিবার্ড।

১৯০৭ সালে ফ্রান্সেই প্রথম হেলিকপ্টার তৈরি হয়। তারপর অনেকটা বছর কেটে গিয়েছে। ১৯৩৬ সাল থেকে মোটামুটি এর চল শুরু হওয়া। তবে, আজ যেভাবে সামরিক কাজে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়, তার সূচনা কিন্তু ১৯৪২ সালে। যুদ্ধে ব্যবহৃত সামরিক হেলিকপ্টারের আবার নানা রকমের আছে। গোটা বিশ্বে সাতাশ রকমের সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। তার থেকে সেরা দশটি পাঠকের জন্য এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।

দেখে নিন বিশ্বের সেরা দশ সামরিক হেলিকপ্টার-

১০. মিল মি – ২৪ হিন্দ (রাশিয়া )

মি-২৪ নামে সারা বিশ্বে এর পরিচিত। গোলা, বারুদ নিক্ষেপ সহায়ক উন্নত ধরনের বন্দুকে সুসজ্জিত এই ধরনের হেলিকপ্টার বিশ্বের পঞ্চাশটি দেশের সেনাবাহিনী ব্যবহার করে। যে কোনও স্থানে সেনা নামানোর কাজেও ব্যবহার করা হয় মি-২৪’কে। যদিও ১৯৯১ সালের পর আর কোনও মি-২৪ হেলিকপ্টার তৈরি হয়নি। তবে, সামরিক ক্ষেত্রে বলা হয়, এরকম ব্যবহারযোগ্য হেলিকপ্টার নাকি এখনও পর্যন্ত তৈরি হয়নি। মি-২৪’তে রয়েছে ২৩মিমি টোয়াইন ব্যারল ক্যানন। এছাড়া, ট্যাঙ্কার বিধ্বংসী ৯এম১৭পি স্করপিওন (এটি-২ সোওয়াটার), ৯এম১১৪ শ্টার্ম (এটি-৬ স্পাইরাল) মিশাইল বহনেও সক্ষম হেলিকপ্টারটি।

৯. বোয়িং এএইচ-৬৪ডি লংবো অ্যাপাচে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)

এই হেলিকপ্টার চারটি ডানাতে ভর করে আকাশে ওড়ে। উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণে এই হেলিকপ্টারটি বেশ সুনাম আদায় করে নিয়েছে। এএইচ-৬৪’এর নতুন ভার্সন হলো এএইট-৬৪ই অ্যাপাচে গার্ডিয়ান। টোয়াইন টার্বোশ্যাফ্ট আক্রমণ হানতে সক্ষম এই হেলিকপ্টার ২০১২ সাল পর্যন্ত এএইচ-৬৪ডি ব্লক থ্রি ভার্সানে তৈরি করা হতো। এরপর তার জায়গা নিয়েছে ওই ই ভার্সনের মডেল। এএইচ-৬৪’এ রয়েছে ৩০মিমি এম-২৩০ ক্যানন। এছাড়া, ১৬এক্স এজিএম-১১৪এল হেলফায়ার ২ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিশাইল, ৪এক্স স্টিঙ্গার, আকাশ থেকে আকাশে হামলা আনতে সক্ষম ২এক্স এআইএম-৯ বা ২এক্স এজিএম-১২২ অ্যান্টি-রাডার মিশাইল বহন করতে পারে অ্যাপাচে। আর রয়েছে ১৯টি হাইড্রা ৭০ পকেট পড।

৮. অগুস্তা এ১২৯ মঙ্গুস্তা (ইতালি)

পশ্চিম ইউরোপে তৈরি হওয়া প্রথম হেলিকপ্টার। প্রযুক্তিগত দিক থেকে অতি উন্নত এই কপ্টার। হাল্কা ওজনের হওয়ার পাশাপাশি দু’টি ইঞ্জিনের এই চপারে দু’জন মানুষ এতে বসতে পারেন। আকাশ পথে হামলা চালানোর জন্য অগুস্তাকে তৈরি করা হয়েছে। এতে রয়েছে ২০মিমি ক্যানন এবং ১২.৭মিমি মেশিন গান। এছাড়া, ৮এক্স টিওডব্লু-২এ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিশাইল, ৫০এক্স৭০মিমি বা তার চেয়ে বড় ৮১মিমি মেডুসা রকেট বহনেও সক্ষম হেলিকপ্টারটি।

৭. ডেনেল এএইচ-২ রুইভাল্ক (দক্ষিণ আফ্রিকা)

দক্ষিণ আফ্রিকার ডেনেল অ্যাভিয়েশন এর নির্মাতা। উন্নত প্রযুক্তির এই সামরিক হেলিকপ্টারটি আগামী দিনের কথা মাথায় রেখে তৈরি। মিশন যেরকম হবে, সেই অনুযায়ী অস্ত্র বহনে সক্ষম হেলিকপ্টারটি। এতে রয়েছে ২০মিমি আর্মস্কর ক্যানন। হেলিকপ্টারটি থেকে ৪এক্স৪ টিওডব্লু বা ডেনেল জেডটি-৬ মোকোপা অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিশাইল ছোঁড়া যায়। এছাড়া, মিশাইলের বদলে ৭০মিমি আন-অপারেটেড রকেট হামলাও চালানো যায় রুইভাল্ক থেকে।

৬. জেড-১০ (চিন)

চিনে তৈরি প্রথম সামরিক হেলিকপ্টার। বলা হয়, ক্ষমতাগুনে এই হেলিকপ্টারটি এ-১২৬ মঙ্গুস্তা বা রুইভাল্কের সমকক্ষ। আলাদা বলতে, এতে বসানো বন্দুকের সরু নল এবং ককপিটের ডিজাইন। জেড হেলিকপ্টারে ৩০মিমি ক্যানন ও আন-অপারেটেট পকেট রয়েছে এবং আধুনিক প্রযুক্তির এই চপারটি আকাশ থেকে আকাশে এইচজে-৯ বা এইচজে-১০, টিওয়াই-৯০ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিশাইল বহনে সক্ষম।

৫. মিল মি-১৭ (রাশিয়া / ভারতে ব্যবহৃত)

রাশিয়ায় তৈরি এই হেলিকপ্টারটি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত হয়। মি-৮ নামে বেশি পরিচিত। ১৯৭৫ সাল থেকে ই হেলিকপ্টার তৈরি করে আসছে রাশিয়া। ২০১৭ পর্যন্ত বারোহাজারেরও বেশি এই ধরনের হেলিকপ্টার তৈরি করা হয়েছে। মেশিন গানের ডিজাইন অনুযায়ী মি-৮’র বেশ কয়েকটি ভার্সন রয়েছে। অত্যন্ত গরম আর বেশি উচ্চতায় যুদ্ধ করতে সক্ষম হেলিকপ্টারটি। এতে রয়েছে পিকেটি মেশিনগান এবং একেএম সাব-মেশিন গান। সেনাবহনেও সক্ষম। আকাশ থেকে যে কোনও বস্তুতে হামলা করাও যায় ছোটো মিশাইলের সাহায্যে।

৪. ইউরো কপ্টার টাইগার (ফ্রান্স/জার্মানি)

জার্মান আর ফ্রান্সের বায়ুসেনা এই হেলিকপ্টার ব্যবহার করে। ২০০৩ সাল থেকে সামরিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে ইউরো কপ্টারে। মাঝারি ওজন এবং চারটি ডানা ওয়ালা দু’টি ইঞ্জিনের এই চপারে ৩০মিমি ক্যানন রয়েছে। এছাড়া, আটটি এইচওটি-২/৩ বা ট্রাইগেট ২ অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিশাইল বহন করাও যায় এতে। আকাশ থেকে আকাশ পথে হামলা চালাতে স্বপ্ল-পাল্লার মিশাইলও বহন করা যায়।

৩. কামরম কা-৫২ হোকুম-বি (রাশিয়া)

আগের চাইতে প্রযুক্তিতে আরও উন্নত করা হয়েছে কা ভার্সনের হেলিকপ্টারকে। কামরভ বি হেলিকপ্টার যে কোনও পরিবেশে ব্যবহার করা যায়। দিন হোক কিংবা রাত, আবার অত্যাধিক গরম বা ঠান্ডা বা বৃষ্টিতেও ব্যবহার করা যায় এই হেলিকপ্টারকে। কা-৫২’তে রয়েছে ৩০মিমি ক্যানন (৪৬০ রাইন্ড)। এছাড়া, এর থেকে ট্যাঙ্কার বিধ্বংসী ১২ ভিখর (এটি-৯ স্পাইরাল) মিশাইল ছোঁড়া যায়। ছোঁড়া যায় আকাশ থেকে আকাশ পথে হামলা চালানোর জন্য চারটি ইগলা-ফাইভ মিশাইল। রকেট হামলা করতে সক্ষম রাশিয়ার হোকুম হেলিকপ্টার।

২. বেল এএইচ-১ জেড ভাইপার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)

বর্তমানে সবচেয়ে উন্নতমানের হেলিকপ্টার। এএইচ-১ কোবরা হেলিকপ্টারের আধুনিক ভার্সন এটি। নজরদারি চানানো যন্ত্রাংশ ছাড়া এতে আধুনিক হাতিয়ার নিক্ষেপরেও বন্দোবস্ত রয়েছে। আকাশ থেকে আকাশ পথে রকেট ছুঁড়ে হামলা চালানো যায় বেল এএইচ-১ জেড থেকে। এতে রয়েছে ২০মিমি থ্রি ব্যারেল ক্যানন (৭৫০ রাউন্ড)। ছোঁড়া যায় এজিএম-১১৪এ/বি/সি ট্যাঙ্কার বিধ্বংসী মিশাইল। বোমা নিক্ষেপ করা যায় এর থেকে। ছোঁড়া যায় আকাশ থেকে আকাশ পথে হিট সিকিং আনগাইডেড রকেট।

১. এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচে গার্ডিয়ান (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)

সামরিক লড়াই এবং প্রযুক্তির দিক থেকে বিচার করলে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মানের হেলিকপ্টার। চারটি ডানাওয়ালা এই চপারে দু’টি টার্বোশ্যাফ্ট ইঞ্জিনের পাশাপাশি পিছনের দিকেও ডানা রয়েছে ভারসাম্য আনতে। দু’জন সেনা বহনে সক্ষম এই হেলিকপ্টারের ককপিট তুলনায় ছোটো হলেও ভারী অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে পারে। তিনশো কিলোমিটার গতিতে প্রতি ঘণ্টায় উড়তে সক্ষম অ্যাপাচে হেলিকপ্টারটিতে রয়েছে ৩০ মিমি ক্যানন। এছাড়া, হেলিকপ্টারটি ১৬টি এজিএম-১১৪এল হেলফায়ার মিশাইল, ২টি অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিশাইল, চারটি এআইএম-৯২ স্টিঙ্গার বা এআইএম-৯ সাইডউন্ডার আকাশ থেকে আকাশ পথে নিক্ষেপ করা মিশাইল বহন করতে পারে। এছাড়া, ২টি এজিএম-১২২ সাইজআর্ম অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিশাইল ব্যবহার করা যায়। রয়েছে ১৯টি হাউড্রা ৭০ রকেট পকেট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: