বিজ্ঞাপন ছাড়াই কি ভাবে আয় করে হোয়্যাটসঅ্যাপ? জেনে নিন অবাক করা কাহিনী

স্মার্টফোন সবার হাতে হাতে এখন। পুরনো কি প্যাডের ফোন এখন আর চোখেই পড়ে না। একের পর এক যত জি জুড়ে চলেছে ফোন আর সিম কার্ডের সঙ্গে, ততই স্মার্ট হয়ে চলেছে ফোন, আর ব্যবহারকারীরা বোকা। কথাটা গায়ে লাগলেও, সত্যি। কেন জানেন?

গত এক দশকে প্রযুক্তি আমাদের জীবনাযাপনের শৈলীটা বদলে দিয়েছে। হাতে একটা স্মার্ট ফোন, আর তাতে হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করা না থাকলে স্ট্যাটাস টা ঠিক যেন মেইনটেইন করা যায় না। ঘুম থেকে উঠেই ফোনটা হাতে নিয়ে তুলে ধরা। রাস্তায় যেতে যেতে আচমকাই পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখে নেওয়া একবার কোনও কারণ ছাড়াই। আবার জরুরি মিটিংয়ের আগে অপেক্ষা করতে করতেও নিজের অজান্তেই হাতের আঙুল ফোনের লক স্ক্রিন ফুটিয়ে তোলে ডিসপ্লেতে। আর আপনিও ফোনটা আনলক করে একবারে দেখে নিলেন কোনও হোয়্যাটসঅ্যাপ মেসেজ আসেনি তো? রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেও সেই একই অভ্যাস।


হোয়্য়াটসঅ্যাপের নেশা এতোটাই পেয়ে বসেছে যে অনেকে সারাক্ষণ নেট অন রেখে দেন। ফোর জি ইন্টারনেট ডেটাও এখন এতোটাই সস্তা হয়ে গিয়েছে যে সারাক্ষণ নেট অন রাখলেও আর গায়ে লাগে না। টাকা যায় যাক, সারাক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপটা অন থাকা চাই। কোনওভাবেই যেন কোনও মেসেজ মিস না যায়, সে যতই অকারণ হোক না কেন! হ্যাঁ অবশ্যই এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে এই মেসেজিং প্ল্যাটফর্মকে বেছে নেন।


আচ্ছা হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুক কিনে নিয়েছে, এটা অবশ্যই জানা আছে আপনার? আচ্ছা, এটাও তো আপনার জানা আছে, ফেসবুকের স্রষ্টা ও কর্ণধার বিশ্বের সর্বকণিষ্ঠ বিলিয়োনিয়ার। কখনও মনে হয়েছে কি, কোথা থেকে এতো অর্থ আয় করেন তিনি। কিন্তু, আপনি তো ফ্রি’তেই ফেসবুক ব্যবহার করেন। তাহলে এতো বিত্তশালী কি করে হলেন এবং হয়েই চলেছেন মার্ক জুকারবার্গ? হোয়্যাটসঅ্যাপও তো আপনি বিনা পয়সায় ব্যবহার করেন, কোনও বিজ্ঞাপণও তো ভেসে ওঠে না তাতে, তাহলে একে কেনই বা ১৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনেছে ফেসবুক?


এর পিছনে একটা মারাত্মক সত্য লুকিয়ে আছে। তাহলে শুনুন, ওই যে আপনি সারাক্ষণ নেট অন রেখে দেন ফোনে হোয়াটসঅ্যাপের আপডেট দেখার জন্য, আপনার ওই আসক্তিকেই কাজে লাগিয়ে আপনার ফোনের ডেটা, লোকেশন, কললিস্ট সব জেনে নিচ্ছে ফেসবুক। ফেসবুকে তথ্য ভাণ্ডার এতোটাই বড় যে সে আপনার সম্পর্কে আপনার থেকে বেশি তথ্য জানে। আজকাল তো আমাদের যেখানে-সেখানে গেলেই ফেসবুকে আপডেট দেওয়া অভ্যেস। ধরুণ আপনি আপডেট দেননি, তবুও কিন্তু আপনার ও আপনার প্রিয়জনদের গোপন তথ্য না জানিয়েই আপনার থেকে চুরি করে ফেলছে ফেসবুক।


যখন আপনি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খোলেন, তখন আপনার কললিস্ট ওপেন করতে হয়, না হলে আপনার প্রিয়জন এবং কললিস্টে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে চ্যাট করতে পারবেন না আপনি। সেই সব তথ্য ফেসবুক জমা করে রাখে তাদের সার্ভারে। যেহেতু ফেসবুক ও হোয়্যাটস অ্যাপ একসঙ্গে লিঙ্ক করা, তাই কোনও কারণে আপনি ফেসবুকে আপডেট না দিলেও সেই তথ্য তাদের কাছে চলে যাচ্ছে এবং সার্ভারে জমা হয়ে যাচ্ছে।


ধরুণ আপনি কোন শপিং মলে গেলেন, আপনার হোয়াটসঅ্যাপ অন। বাড়ি ফেরার পথে বা বাড়ি ফিরে হঠাৎ ফেসবুক চেক করতে গিয়ে দেখলেন, আপনি শপিং মলে যে যে জিনিস দেখতে গিয়েছিলেন, ঠিক সেই পণ্যেরই বিজ্ঞাপণ ভেসে উঠছে আপনার। অনেকেরই এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু কাকতালীয় ঘটনা ভেবে এড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু, ব্যাপারটা মোটেই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়।


জানেন, ফেসবুকে যে বিজ্ঞাপণ দেওয়া হয়, ফেসবুক তাদের প্রযুক্তিক সাহায্যে ওই বিজ্ঞাপণকে টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছে দেয়। মানে আপনি আপনি যেটা যেটা পছন্দ করেন, সেটা আপনি ভুলে গেলেও, ঠিক মনে রাখে ফেসবুক। আর সেই বিজ্ঞাপণই আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়া কাজ ফেসবুকের। টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে তাদের পণ্যের যোগসূত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিজ্ঞাপণদাতাদের কাছ রেভেনিউ নেয় ফেসবুক। শুনলে অবাক হবেন, আপনি যদি ভেবে থাকেন ফেসবুক আপনি বিনা পয়সায় ব্যবহার করছেন, তা মোটেও না। বছরে আপনি ১০ থেকে ১২ ডলার খরচ করছেন ফেসবুকের সুবিধা নেওয়ার জন্য। আর নিজেও তা জানেন না। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৬০০-৮০০ টাকা আর আপনাকে বিনা পয়সায়, বিনা বিজ্ঞাপণ দেখিয়ে হোয়্যাটসঅ্যাপ ব্যবহার করানো হচ্ছে, যাতে আপনি আপনার গোপন তথ্য সহজেই তাদের হাতে তুলে দেন। আর সেই তথ্য জেনে নিয়ে আপনার ও আপনার প্রিয়জনদের কাছে বিজ্ঞাপণদাতাদের হয়ে তাদের পণ্য সহজলভ্য করে তুলছে ফেসবুক। সেই সঙ্গে আপনার আরও অনেক তথ্য সে রেখেই দিচ্ছে। যেমন কার সঙ্গে বেশি কথা বলেন। কাকে নিয়ে বেশি ট্যাগ করেন পোস্টে। সবকিছুই…আর আপনি ভাবছেন, পোস্টের প্রাইভেসি সেটিংসে তো ‘অনলি মি’ বা ‘অনলি ফ্রেন্ডস’ করা আছে। আসলে গোপন বললেও কোনও কিছুই গোপন নয়…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: