জেনে নিন ভ্যালেন্টাইন’স ডে র পিছনে থাকা অজানা ইতিহাস!

ভ্যালেন্টাইন’সে ডে। জানেন এর মানে কি? অবশ্যই জানেন… প্রেমের দিবস। বছরে একবার আসে। রোমান্টিক ভালোবাসা, বন্ধুত্বের ভালোবাসা, মায়ের প্রতি ভালোবাসে, ভাই-বোনেদের ভালোবাসা, আবার অনুরাগীদের ভালোবাসা – এই দিনটিতে বিশেষভাবে দেখানো হয়। বছরের সব দিনই দেখানো যায় বটে, কিন্তু একটা বিশেষ দিন পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং মনের মানুষের কাছে নিজের ভালোবাসাটা বিশেষ ভঙ্গিমায় পৌঁছে দেওয়ার দিন। একটা ছোট্টো মেসেজের সঙ্গে চকোলেট। আর প্রেমিক-প্রেমিকারা ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ স্মরণীয় করে রাখেন ভ্যালেন্টাইন’স ডে কার্ড, ফুল আর চকোলেট দিয়ে। সারা বিশ্বের সঙ্গে ভারতেও দিনটি বিশেষভাবে মর্যাদা পায়। কারণ, প্রেম, ভালোবাসাকে কোনও বাঁধনই বাঁধতে পারে না। কোনও দেশের সীমানা প্রেমকে রুখতে পারেন না। প্রেম অমর ও চিরসত্য।

কোথা থেকে এল এই ভ্যালেন্টাইন’স ডে?

সন্ত ভ্যালেন্টাইন। তৃতীয় শতকের রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’কে নিয়ে অনেক গল্প আছে। আর সেইসব শতাব্দী প্রাচীন গল্প মুখে মুখে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে ইতিহাসে স্রোতের সঙ্গে বইতে বইতে। চাইলে মহাকাব্য বলতে পারেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জীবনকে। কারণ, ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রত্যেক বছর আমরা তাঁকেই স্মরণ করি নিজের সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসতে গিয়ে।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন তখন ক্যাথোলিক ধর্মযাজক। সেই সময় রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের রাজত্ব চলছে। তখন আবার রোমানদের খ্রিস্টান ধর্ম নেওয়ার একটা চল শুরু হয়। কিন্তু শাসক দ্বিতীয় ক্লডিয়াস খ্রিস্টান ধর্মের বিরোধী ছিলেন। ফলে তিনি আইন জারি করেন খ্রিস্টানদের শায়েস্তা করতে এবং রোমানদের খ্রিস্টান ধর্মমত গ্রহণ করা থেকে আটকাতে।

ক্লডিয়াস মনে করতেন, রোমান সৈনিকদের রোমের প্রতিই সমস্ত আনুগত্য দেখানো উচিত। আর তাই তিনি বিয়ে করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সেই সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন খ্রিস্টান ধর্মমতে গোপনে বিয়ে দেওয়া শুরু করেন রোমানদের। আর তখন ভালোবাসা গুরুত্ব ও মর্যাদা পেতে শুরু করে।

দ্বিতীয় ক্লডিয়াস কোনওভাবে সেই সমস্ত খবর জানতে পেরে যান এবং সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’কে তিনি অপরাধী আখ্যা দিয়ে কারারুদ্ধ করেন। শোনা যায়, বন্দি অবস্থায় ওই জেলের অন্যান্য বন্দি এবং প্রধান কারারক্ষীর অন্ধ কন্যার প্রতি বিশেষ সদয় ছিলেন ভ্যালেন্টাইন। গল্প বলে, অন্ধ মেয়েটির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন ভ্যালেন্টাইন। মত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের শেষ ইচ্ছে ছিল, মেয়েটির উদ্দেশে তিনি একটি কবিতা লিখে যাবেন। আর তার তলায় লেখা থাকবে, তোমার ভ্যালেন্টাইন। ২৭০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন শহিদ হন।

 

ভ্যালেন্টাইন’স ডে-এর প্রচলন…

সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুর ২০০ বছর পর ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি বিশেষ মর্যাদা পায় তাঁর নামে। রোম তখন পুরোপুরি খ্রিস্টীয় ধর্মাবলম্বী হয়ে উঠেছে। ক্যাথোলিক চার্চ খ্রিস্টীয় ধর্মমত বিরোধী যে কোনও বিষয়ক মুছে ফেলার অঙ্গীকার নেয়। ওই সময় ফেব্রুয়ারি মাসে খ্রিস্টান ধর্মমত বিরোধীদের ফলন উৎসবের চল ছিল। ক্যাথোলিক পোপ সেই উৎসবকে গোড়া থেকে নির্মূল করতে ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে রূপে পালন কররা রীতি চালু করেন। ক্যাথোলিক ক্যালেন্ডারে সেই প্রথম ভ্যালেন্টাইন’স ডে-এর সূচনা।

মধ্যযুগীয় কবি চসার প্রথমবার তাঁর কবিতায় সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামকে রোমান্টিক ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত করেন। সেই থেকে ভালোবাসার দিন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া শুরু হয় ১৪ ফেব্রুয়ারির। তবে, এখনকার মতো জনসমক্ষে নয়, তখনকার রীতি ছিল গোপনে। এইভাবে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে দিনটি। বলা হয়, সেই সময় প্রেমের হাইকোর্টও ছিল। আর প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি মহিলাদের বিচারসভা বসত। বিচারপতি হতেন মহিলারাই। যদিও ইতিহাসবিদরা বলেন, আসলে ওটা হাইকোর্ট নয়, ওটা প্রেমময় কবিতা সভার আয়োজন করা হতো। যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরকে রোমান্টিক কবিতা শোনাতেন। সঙ্গে চলত ফ্লার্টিং।

ভ্যালেন্টাইন’স ডে চিহ্ন…

প্রেমের এই বিশেষ দিনটিতে প্রেমময় বার্তা বিশেষ রকমের কার্ডের লেখার চল মনের মানুষের প্রতি গভীর প্রেম ও স্নেহ বোঝানোর জন্য। সেই সময় নকশাকাটা কার্ড হাতে তৈরি করা হতো। যাঁকে পাঠানো হচ্ছে, তিনি কতটা সুন্দর, তাঁর প্রতি কতটা ভালোবাসা রয়েছে, সেইসব তাতে লেখা হতো। কিউপিডের ছবি, হৃদয়ের নকশা এবং ফুল ছবি আঁকা হতো কার্ডে। তার সঙ্গে লেস ও রিবন দিয়ে কার্ডের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করা হতো।

 

বর্তমানে ভ্যালেন্টাইন’স ডে…

এখন পৃথিবীন নানা প্রান্তে বিভিন্ন দেশ নানাভাবে পালন করে ভ্যালেন্টাইন’সে ডে। কোথাও এই দিনটিতে পরিবার সমস্ত ব্যক্তি একযোগে মিলিত হয়ে একে অপরের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা দেখান। আবার কোথাও প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে দিনটি রোমান্টিকভাবে উদযাপন করেন। কোথাও আবার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের লজেন্স, ললিপপ আর চকোলেট দেওয়ার চল।

তবে, সারা বিশ্বে বেশি প্রচলিত প্রেমিক যুগলের দিন হিসেবে। প্রেমিক-প্রেমিকা এই দিনটিতে কোনও বাঁধন ছাড়া একের অপরের সঙ্গে নিজের মতো করে দিনটিকে উপভোগ করেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। কালের নিয়মে ঐতিহ্যমণ্ডিত ঐতিহাসিক দিনটিতে তাঁর আসল ইতিহাস অনেকে ভুলে গেলেও বা না জানলেও ,প্রথামত পালন করে চলেছে ঠিকই। কার্ড দেওয়া, সিনেমা দেখা, একে অপরের সঙ্গে প্রেমভরা মুহূর্ত কাটানো এবং রাতে রোমান্টিক ডিনার এখন এইসবই চল আধুনিক বিশ্বের। আর গিফ্ট দেওয়া আবশ্যিক সঙ্গে। তবে, বেশিরভাগ দেশে ভ্যালেন্টাইন’স ডে গিফ্ট মানে হলো কার্ড, শ্যাম্পেন, চকোলেট দেওয়া-নেওয়া আর প্রেমভরা মুহূর্তের সঙ্গে রোমান্টিক ডিনার। এই হলো আজকের ভ্যালেন্টাই’স ডে। ধর্মরক্ষা করতে গিয়ে রাজার আদেশ অমান্য করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের শহিদ হওয়ার দিনটি যে উদ্দেশ্য নিয়ে সূচনা করা হয়েছিল, বর্তমানে তা একেবারেই বদলে গিয়েছে।

তবে, প্রেম চিরন্তন। মনের মানুষকে আরও বেশি করে ভালোবাসুন। তাকে খুশি রাখুন এবং এভাবেই আজীবন ভালোবেসে চলুন… এভাবেই সেন্ট ভ্য়ালেন্টাইন বেঁচে থাকবেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের মনের মধ্যে দিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: