কত রকমের বিরিয়ানি খেয়েছেন আপনি? জানেন কোথা থেকে ভারতে এলো বিরিয়ানি?

বিরিয়ানি…নামটা শুনলেই কেমন যেন মন খাইখাই করে। অদ্ভূত একটা রসনাতৃপ্তির বাসনা রয়েছে নামটার মধ্যে। গন্ধটা একবারে নাকে গেলে, না খেলে মন শান্ত হওয়াটা মুশকিল। বিরিয়ানি পছন্দ করেন না, এমন মানুষ এদেশে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আর এই খাবারের ভালোবাসার টান শুধু এদেশেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের বাইরে অনেক দেশেই এখন বিরিয়ানি পাওয়া যায়। ভারতের এক এক রাজ্যে এক একরকম বিরিয়ানি তৈরি হয়। তার স্বাদও আলাদা আলাদা। আর সেজন্য ভারতের বিরিয়ানি এতো বিখ্যাত।

কোথা থেকে ভারতে এলো বিরিয়ানি? জানেন কেন বিরিয়ানিতে লাল কাপড় জড়ানো থাকে?

ইতিহাস বলছে, বিরিয়ানির জন্ম ভারতে নয়। বাইরে থেকে আমদামি হয়ে এসেছে।

কিভাবে? সেটা জানানোর জন্যই তো লিখতে বসা। শুনুন তাহলে…

বিরিয়ানি পারস্য দেশের খাবার। পারসি ভাষা বিরিয়ান থেকে বিরিয়ানি কথাটি এসেছে। মানে হলে সেদ্ধ করার আগে ভাজা। আর পারসি ভাষায় বিরিঞ্জ মানে হলো চাল বা ভাত বলতে পারেন। ভারতে বিরিয়ানি রন্ধন পদটি আসা নিয়ে নানান ঐতিহাসিক উল্লেখ আছে। তবে, এটা ঠিক, দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে বিরিয়ানির আগমনের আগে এর উৎপত্তি কিন্তু পশ্চিম এশিয়াতে।

ঐতিহাসিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩৯৮ সালে ভারত সীমান্তে তুর্কি-মোঙ্গল বিজেতা সম্রাট তৈমুর এসে পৌঁছান। যুদ্ধজয়ে বেরনো তৈমুরের সেনাদের খাবার রান্না হতো বড় বড় মাটির হাঁড়ির মধ্যে। তাতে চাল, নানারকম মশলা, আর যেখানে যে মাংস পাওয়া যেত, তা একেবারে ঠেঁসে ভর্তি করে আগুন জ্বেলে হাঁড়িগুলি তার ভেতরে রেখে দেওয়া হতো। এরপর সময় মতো তা বের করে সেনাদের মধ্যে তা বিলি করা হতো খাবার হিসেবে।

আরেকটি ঐতিহাসিক তথ্য মতে, বিরিয়ানি নাকি এসেছে দক্ষিণ মালাবার উপকূল থেকে। সেই সময় আরব দেশ থেকে বাণিজ্যের কারণে অনেকে ভারতে আসতেন। তাঁদের সঙ্গেই বিরিয়ানি চল ভারতে আসে। আরব দেশের সেনাদের খাবার। খ্রিস্টের জন্মের দু’বছর পরের সমসমায়িক তামিল সাহিত্য বলছে, উন সরু নামে সেই সময় এক ধরণের খাবার রান্নার চল শুরু হয়। চাল, ঘি, মাংস, হলুদ, ধনে, লঙ্কা এবং তেজপাতা একসঙ্গে দিয়ে রান্না করা হতো। আর তা সৈন্যদের মধ্যে বিলি করা হতো রোজকার খাবার হিসেবে।

বিরিয়ানির মোঘল ইতিহাস…

তবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ওপর নির্ভর করতে গেলে মোঘল ইতিহাসেই বিশ্বাস করতে হয়। বিরিয়ানি নাকি সারা ভারতে মুমতাজ মহল থেকে ছড়িয়ে পড়েছে। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পত্নী মুমতাজ বেগমের কথা সবাই জানেন। তার নামেই আগ্রার বিখ্যাত তাজমহল। বলা হয়, মুমতাজ বেগম একদিন সেনা ছাউনি পরিদর্শনে যান এবং সেখানে গিয়ে দেখেন, মুঘল সেনারা বড্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের দেখে তার মনে হয়েছিল, সেনারা ঠিক মতো খাবার পাচ্ছে না। তখন তিনি রাঁধুনীকে বলেন, এমন একটা খাবারের পদ আবিষ্কার করতে, যাতে মাংস আর চালের পরিমাণ ঠিকমতো থাকবে এবং সেনারা পুষ্টিও পাবে। এভাবেই বিরিয়ানির আবিষ্কার। সে সময় চাল ঘিয়ে ভাজা হতো। রান্না করার আগে ধোয়াও হতো না, যাতে চালের দানা ভেঙে না যায় এবং মিষ্টি স্বাদটা একই রকম থাকে। কাঠের আগুনে রান্না করতে বসানোর আগে তার সঙ্গে মাংস, সুগন্ধী মশলা এবং জাফরান ভালো করে মেশানো হতো।

হায়দরাবাদের নিজাম এবং লখনউয়ের নবাবরাও ভারতে রসনাতৃপ্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাদের ভাঁড়ার ঘর থেকে রাঁধুনিরা যেসব পদের জন্ম দিয়েছেন, তাও কম বিখ্যাত নয়। আজও তার চল রয়েছে ভারতীয়দের পছন্দের নানান খানা-পিনায়। তাদের কারণেই বিরিয়ানি আজ এতোটা বিখ্যাত। মেহমানদের দাওয়ত দিয়েই এর প্রসার সারা ভারতে। আর ওই রাজ্যের বিরিয়ানির স্বাদও আলাদা। বিরিয়ানির সঙ্গে আরও নানা পদ পরিবেশন করা হতো। এভাবেই সারা ভারতে পরিচিত হয়ে পড়ে মিরচি কা সলান, ধনশক, বঘরা বেঙ্গনের মতো সুস্বাদু পদ।

সুস্বাদু বিরিয়ানি বানানোর জন্য সব উপকরণের পরিমাণ ঠিকমতো হওয়া চাই। নাহলে স্বাদটা ঠিক মতো আসে না। পারসীয় মতে বিরিয়ানি তৈরির যথার্থ পদ্ধতি হলো দম পুখ্ত। মানে ধীরে ধীরে রান্না হতে দিতে হবে। পারসি ভাষায় দম পুখ্ত কথার অর্থ হলো, ধীমে আঁচের উনুন। কখনও কখনও হাঁড়ির ওপরে আঁচ রেখে ধীর ধীরে তাকে সেদ্ধ হতে দেওয়া হতো। হাঁড়ির ঢাকনা আটার লেচি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হতো একেবারে। তাপ পেয়ে কাঁচা মাংসের মধ্যে থেকে যে জল বেরতো, তা দিয়েই তা সেদ্ধ হতো মাংস এবং সেই সঙ্গে চালও ভাতে পরিণত হতো স্বাদ পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। মশলার ব্যবহার অবশ্যই প্রয়োজনীয় বিরিয়ানি তৈরিতে। বলা হয় বিরিয়ানি তৈরি করতে সেই সময় পনেরো রকম মশলার ব্যবহার করা হতো। বিরিয়ানি তৈরির প্রধান উপকরণ অবশ্যই মাংস। তবে, ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া এসব দিয়েও বিরিয়ানি তৈরির চল শুরু হয়। মধ্যযুগীয় সময় থেকে বিরিয়ানিতে গোলাপ জল, আতর ও ক্যাওড়া জল দেওয়ার প্রচলন শুরু হয়।

উত্তর ভারতে লম্বা বাদামী চাল দিয়ে বিরিয়ানি তৈরির চল ছিল। এখন সেই জায়গা বাসমতি চাল নিয়েছে। যদিও এখনও অনেকে বাদামি চাল দিয়েও বিরিয়ানি তৈরি করেন। দক্ষিণ ভারতে আবার নানা রকম চাল দিয়ে বিরিয়ানি তৈরি করা হয়। স্থানীয় অনেক মশলাও ব্যবহার করা হয়। ফলে স্বাদও এক একটার এক একরকম হয়। যেমন – জিরা সাম্বা, কাইমা, জিরাকাশলা, কালা ভাত ইত্যাদি।

তবে, পদ্ধতিগতভাবে বিরিয়ানির মূলত দু’রকমের – কচ্চি বিরিয়ানি এবং পক্কি বিরিয়ানি। কাচ্চি বিরিয়ানিতে মাংসের সঙ্গে কাঁচা চালই ব্যবহার করা হয়। হাঁড়ির ভেতরে স্তরে স্তরে সাজিয়ে আগুনের ওপরে বসানো হয় রান্না করতে। আর পক্কি বিরিয়ানিতে আগে থেকে সেদ্ধ করে নেওয়া মাংসের সঙ্গে ভাত ব্যবহার করা হয়। হাঁড়ির মধ্যে স্তরে স্তরে সাজিয়ে যাবতীয় উপকরণ দিয়ে ভাজা হতে দেওয়া হয়। বিয়ে বাড়িতে পক্কি বিরিয়ানি পরিবেশনের চল রয়েছে।

বিভিন্ন রকমের বিরিয়ানি : সারা ভারত ঘুরলে নানা রকম বিরিয়ানির স্বাদ নিতে পারবেন। তবে, তার মধ্যে থেকে পনেরো রকমের বিরিয়ানি খুব বিখ্যাত।

১. মুঘলই বিরিয়ানি

বড়বড় মাংসের টুকরোকে নানান সুগন্ধী মশলার সঙ্গে মেশানো হয়। তারপর তাকে কেওড়া জল মেশানো সুগন্ধি চালে সঙ্গে মেশানো হয়। এই বিরিয়ানি যেমন সুস্বাদু, তেমন তার গন্ধ। নাকে গেলেই মুখে জল চলে আসবে। আর খেলে একেবারে রাজকীয় স্বাদ কাকে বলে বুঝবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: