যে মহিলার জন্য পার্থ চ্যাটার্জিকে একহাত নিলেন, মেয়র পদও ছাড়তে রাজি আছেন শোভন চ্যাটার্জি

মিটেও মিটল না। কাল দিদি-র এক ফোনে মেয়র শোভনের পদ বেঁচে যাওয়ার ইঙ্গিত ছিল৷ কিন্তু ফের বেঁকে বসলেন শোভন চ্যাটার্জি। ওয়েবকুপা ’র প্রাক্তন সম্পাদিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি পার্থ চ্যাটার্জি-র লোক। সেটা অস্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি বলেছিলেন, সোমবার বিধানসভায় পার্থ বলেন , ‘দলের সবাই সহকর্মী৷ দলের যে কোনও শাখা সংগঠনের কর্মীরাই আমাদের সহকর্মী৷ কেউ ঘনিষ্ঠ নয়৷ ’

আজ সেটা নিয়ে পার্থ চ্যাটর্জিকে একহাত নিলেন শোভন। মেয়র বললেন, “প্রয়োজনে অনেকেই বৈশাখীর কাছ থেকে সাহায্য নিয়েছেন, আজ ভুলে গিয়েছেন। আমার পক্ষে বৈশাখীকে ভোলা সম্ভব নয়।”পাশাপাশি শোভন বলেন, ওয়েবকুপা থেকে বৈশাখীর অপসরণ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমার পাশে দাঁড়ানোর জন্য যদি ওঁর উপর কোনও আঘাত আসে, আমি কখনই তা মেনে নিতে পারব না।”

২০১০ সালে তৃণমূল কলকাতা পুরসভা জেতার পর মমতা বলেছিলেন, কোনও নেতা নয়, মেয়র করা হবে একজন কর্মীকে। এরপর শহরের মহানাগরিকের সিংহাসনে বসেন ‘কর্মী’ কানন। এরপর বিগত কয়েক বছর রাজনৈতিক কেরিয়ারে চরম উত্থান ঘটলেও সম্প্রতি বেশ খানিকটা ব্যাকফুটে শোভন চট্টোপাধ্যায়। ২৪ বছরের দাম্পত্য ভেঙে বিবাহ বিচ্ছেদ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কমে যাওয়া, দলে ক্ষমতা হ্রাসের গুঞ্জন এবং অধ্যাপিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব- বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বারবার বিতর্কের সম্মুখীন শোভন।

কে এই বৈশাখি বন্দ্যোপাধ্যায়


মিল্লি আমিন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়। এক সময়ে কলেজ শিক্ষকদের সংগঠন ওয়েবকুটার সদস্য থাকলেও ২০১৪-তে তিনি যোগ দেন তৃণমূল প্রভাবিত শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপায়। সেখানে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তিও ছিল অনেক বেশি। বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্য এক পরিচয়ও আছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক মনোজিত মণ্ডলের স্ত্রী তিনি। মনোজিত মণ্ডল প্রথম থেকেই বাম বিরোধী এবং তিনি ওয়েবকুপার সদস্য। কিন্তু বৈশালী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে ছিলেন ওয়েবকুটায়। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর মিল্লি আমিন কলেজের পরিচালন কমিটির তৎকালীন সভাপতি সুলতান আহমেদের সঙ্গে গণ্ডগোলের জেরে কলেজে ঢুকতে বাধা পান বৈশালী। সেই সময় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ব্রাত্য বসু। ওয়েবকুটার পদাধিকারীরা জানিয়েছেন, সেই সময় বৈশালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাকরি বাঁচাতে পাশে দাঁড়িয়েছিল ওয়েরকুটা। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অভিযোগ জানানো ছাড়াও, মানবাধিকার কমিশন এমন কী রাজ্যপালের কাছেও বৈশালীর জন্য দরবার করেছিল ওয়েবকুটা। ২০১৪ সালে বৈশালী বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়েবকুটার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে ওয়েবকুপার যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতার সাংবাদিক মহলেও তাঁর যাতায়াত ছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যেত।

প্রিয় শিষ্যের রাগ ভাঙাতে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এ দিন সকালে ফোন করেন শোভনকে৷ তাতেই বরফ গলে৷ শোভন নেত্রীর কাছে কার্যত ভেঙে পড়েন৷ শোভন তাঁকে কথা দিয়েছেন , দলের বিশ্বস্ত সৈনিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন৷ দল ছাড়ার ভাবনা তাঁর মাথায় আসেনি৷ বেহালা পূর্বের বিধায়ক জানান, নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনই তাঁকে বৈশাখীর ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করেননি। বস্তুত, বৈশাখীর প্রশ্ন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কেন আসছে, সেটা নিয়েই মর্মাহত শোভন। এদিন সরাসরি শোভন অভিযোগ করেন, ব্যাক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করতেই অনেকে বৈশাখীর সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রাজনৈতিক জীবনকে বিপর্যস্ত করতে চাইছে।

মেয়র ঘনিষ্ঠদের দাবি , নানা কারণে দলের সঙ্গে শোভনের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল , সেটা অনেকটাই কমেছে৷ মুখ্যমন্ত্রীর ফোন পাওয়ার পর থেকেই মেয়রের শারীরিক ভাষা বদলে গিয়েছে৷ ফিরে এসেছে ফুরফুরে মেজাজ৷ গত কয়েকদিন ধরে নিজেকে গুটিয়ে রাখছিলেন মেয়র৷ নজরুল মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা দলের বর্ধিত কোর কমিটির বৈঠকেও গরহাজির ছিলেন৷ এই ক’দিন রোজ পুরসভায় এলেও সবার সঙ্গে দেখা করেননি৷ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলতে রাজি হননি৷ পুর বাজেটের দিন প্রথা ভেঙে তিনি শোক প্রস্তাব পাঠ হয়ে যাওয়ার পরে অধিবেশন কক্ষে ঢোকেন৷ তা নিয়ে বিরোধীরা হইচই শুরু করে দেয়৷ দলের অন্দরেও শোনা যাচ্ছিল , মেয়রকে হয়তো বাজেট অধিবেশনের পরেই সরিয়ে দেওয়া হবে৷ ভাবি মেয়র হিসাবে অরূপ বিশ্বাস , দেবাশিস কুমারের মতো একাধিক তৃণমূল নেতার নাম শোনা যাচ্ছিল৷ মেয়রের এ দিনের মন্তব্যের পরে সেই জল্পনার অবসান ঘটল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷ তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা জানাচ্ছেন , মেয়রের আচরণে দলনেত্রী অসন্ত্তষ্ট হলেও পঞ্চায়েত ভোটের মুখে তাঁর মতো পোড়খাওয়া নেতাকে বিরোধী শিবিরের হাতে তুলে দিতে চাইছেন না তিনি৷ তা ছাড়া , শোভন তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সৈনিক৷

তাঁকে ব্যক্তিগত ভাবেও স্নেহ করেন মুখ্যমন্ত্রী৷ সেটাও একটা বড় ফ্যাক্টর৷ শোভনের বিজেপি ’তে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন , ‘আমাদের দরজা সকলের জন্য খোলা৷ তবে আমরা একটু ফিল্টার করে নেব৷ ’ মুকুল রায় বলেন , ‘গ্রামসভা থেকে রাজ্যসভা অনেকেই যোগাযোগ রাখছেন৷ এর বেশি কিছু এখন বলব না ’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় অবশ্য শোভনের বিজেপিতে যোগদানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন৷ ঘনিষ্ঠতা বিতর্কে তৃণমূলের কলেজ শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপা ’র প্রাক্তন সম্পাদিকা বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক হাত নিলেন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়৷ একদিন আগেই বৈশাখী বলেন , ‘আমি তো পার্থর ঘনিষ্ঠ ছিলাম , সেই কারণে ওয়েবকুপার সম্পাদক হয়েছিলাম৷ ’ সোমবার বিধানসভায় পার্থ বলেন , ‘দলের সবাই সহকর্মী৷ দলের যে কোনও শাখা সংগঠনের কর্মীরাই আমাদের সহকর্মী৷ কেউ ঘনিষ্ঠ নয়৷ ’৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: