মুকুল রায়ের বিদায়ে যে পাঁচ কারণে খুশি তৃণমূল নেতারা

মুকুল রায় বিজেপি-তে যোগ দেওয়ার পর, রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়। জোড়া ফুলের মুকুল মাইনাসে কার লাভ, কার ক্ষতি হিসেব করতে বসে গিয়েছে সবপক্ষই। এতদিন আমরা মুকুল যোগে বিজেপি-র লাভের কথা বলে ছিলাম। আজ দেখে নেবো মুকুল বিদায়ে তৃণমূলের একটা অংশ কেন খুশি সেই পাঁচটা কারণ দেখে নেবো–

৫) দলের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মুকুল: আগে একটা সময় দলের সম্পদ ছিলেন সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু শেষের দুটো বছর নাকি জলের বোঝা গিয়েছিলেন মুকুল রায়। যে ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য তাঁর সুনাম, সেই ড্যামেজ কন্ট্রোলারই নাকি ড্যামেজ করে বসছিলেন। ২০১৬ বিধানসভার পর নাকি এক জেলা নেতার সঙ্গে দলের এক শীর্ষনেতার ঝামেলার পিছনে ছিলেন মুকুল। শেষের দিকে মুকুল নাকি আর নড়ছিলেন না। তাই দলের বোঝা ঝেড়ে ভালই নাকি হয়েছে।

৪) নতুন ভাবনার দরকার ছিল: ২০০০ সালের রাজনীতি ২০১৭ সালে এসে কিছুটা অচল হয়ে পড়েছিল। তা ছাড়া নাকি মুকুল রায় বিরোধী সংগঠনটা যতটা ভাল করে চালান, অভিজ্ঞ শাসক দলের সংগঠনটায় ততটা দক্ষ নন। দেখতে দেখতে ৬টা বছর হয়ে গেল তৃণমূল সরকারের। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে শাসক তৃণমূল দলটাও অভিজ্ঞ- পরিণত হয়েছে। কিন্তু মুকুল শাসক তৃণমূলের সংগঠনটা এখনও বিরোধী তৃণমূলের মত করেই চালাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ।

৩) দলের গোপন কথা ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল: অনেকেই অভিযোগ করছিলেন বেশ কয়েকটা মাস ধরে দলের গোপন কথা মিডিয়ায় ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল। আর এই ফাঁসের নেপথ্যে নাকি…তাই ঘরের শত্রু চলে যাওয়ায় খুশি তৃণমূলের একটা অংশ।

২) ক্যাম্পবাজি বন্ধ হওয়ার সুযোগ: জেলায় জেলায় নিজের একটা গোপন ক্যাম্প তৈরি করেছিলেন মুকুল। পার্থ, সুব্রত-রা সেভাবে দলকে সময় দিতে পারছিলেন না সেই সুযোগে মুকুল নাকি ক্যাম্পবাজির চূড়ান্ত করেছিলেন। জেলার যে নেতারা তার সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে, দিদির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চাইতেন, তাদের সাইড করে দিতেন মুকুল এমন অভিযোগও উঠছে।

১) কেলেঙ্কারির উত্স ছিলেন: ছোট-বড় অনেক কেলেঙ্কারির শুরুটা নাকি তিনিই করতেন। মুকুল বিরোধীদের অভিযোগ, দলের বিরুদ্ধে ওঠা এমন কোনও কেলেঙ্কারি নেই, যেটাই মুকুল রায়ের নাম নেই। তাই সব দিকে মুকুল বিদায় নাকি ভাল হয়েছে। মুকুল রায়কে নিয়ে যে পাঁচটা কারণে ভয় তৃণমূলের

তবে তৃণমূলে মুকুলের গোপন সমর্থকও অনেকে আছেন। তারা বলছেন…

মুকুল রায়ের মত সংগঠন সামলানোর লোক তৃণমূলে খুঁজে পাওয়া যায় না। বীরভূমের একেবারে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কোচবিহারের ছোট গলি। মুকুল রায় চেনেন না এমন কোনও রাস্তা, দলের লোক নেই। মুকুলের স্মৃতিশক্তিটাও দারুণ। সব মিলিয়ে তৃণমূলে এমন নেতা আর নেই। মুকুল সরতেই বট গাছের অভাবটা টের পাচ্ছে তৃণমূল। ড্যামেজ কন্ট্রোলেও তিনি ছিলেন সেরা। মুকুল রায় যখন বিজেপি-তে সরকারীভাবে নাম লিখিয়ে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন, তখন তৃণমূলের এক এক নেতার, এক জেলার একরকম শরীরীভাষা। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে তৃণমূল ভবনে নেতাদের মুখে বেঁকা হাসি। অনেকে তৃণমূল নেতাই বলছেন, মুকুলের দশা কংগ্রেসের বাকি নেতাদের থেকেও খারাপ হবে। পার্থ চ্যাটার্জি হাসিটাই বলে দিচ্ছিল, মুকুল রায় বিজেপিতে যাওয়াটা একদিকে তাদের ভালই হল। কারণ মুকুল যতদিন তৃণমূল থেকে ঝরছিলেন না, ততদিন অস্বস্তিতে ছিলেন পার্থ-রা। তারপর যখন তৃণমূল ছাড়লেন, তখন যতক্ষণ না মুকুল বিজেপি-তে যোগ দিচ্ছিলেন, তাঁর গতিবিধির দিকে নজর রাখতে গিয়ে সময় খরচ হচ্ছিল। এবার পদ্মে পা দেওয়ার লড়াইয়া সরাসরি হয়ে গেল। তৃণমূলের একটা অংশ বলছে, মুকুল রায় বিজেপি-তে যোগ দেওয়ায় রাজ্য বিজেপিতে কোন্দল চরমে উঠবে। মুকুল তৃণমূলের যে বিক্ষুব্ধ অংশটা ভাঙিয়ে নিয়ে বিজেপিতে যাবেন তারা প্রত্যেকেই ভোটে দাঁড়াতে চাইবেন। কিন্তু যারা এতদিন বিজেপি করে এসেছেন, তারা এটার বিরোধিতা করবেন। বিজেপি-তে মুকুলের যোগদানে যে ১০টা প্রশ্নের ওপরেই নির্ভর করছে রাজ্য রাজনীতির ভবিষ্যত

তবে এটা হল তৃণমূলের একটা অংশের বক্তব্য। এমনিতে রাজ্যে বিজেপি শক্তিশালী হচ্ছে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় আরএসএস দারুণভাবে সক্রিয় হচ্ছে। ২০১৯ লোকসভায় রাজ্যে বেশি আসন পেতে বিজেপি যেভাবে ঝাঁপি্য়েছে, তাতে তৃণমূল যে একটু নার্ভাস সেটা সবার জানা। এমন সময় কোথায় সর্বশক্তি দিয়ে মোদীকে আক্রমণ করা হবে তা নয়, কোথা থেকে নিজের দলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ লোকটাকেই হারালেন মমতা। অপ্রত্যাশিত ঝামেলা সবাইকে বিব্রত করে। তাই মুকুলকে নিয়ে চিন্তায় তৃণমূল। মুকুল রায় দল ছাড়ার পিছনে একটা বড় কারণ হিসেবে তৃণমূল মহলে বলেছেন, আত্মসম্মান থাকলে আর এই দলটা করা যায় না। তৃণমূলের অনেক নেতারাই কথাটা স্বীকার করছেন। কিন্তু যেহেতু দল এখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাই কেউ সাড়া করছেন না। মুকুল শুরুটা করে দিয়ে গেলেন। তাই ছাড়া দল ছাড়লেও তৃণমূলের বেশ কিছু নেতার তিনি এখনও প্রিয় পাত্র। বিজেপি-তে মুকুলের যোগদানে যে ১০টা প্রশ্নের ওপরেই নির্ভর করছে রাজ্য রাজনীতির ভবিষ্যতমমতা, অভিষেক, পার্থদের রোষানলে পড়তে হবে বলে অবশ্য কেউ সরাসরি মুকুলের হয়ে বলছেন না। তবে তৃণমূল ভবনের নেতারা বুঝেছেন, মুকুল গেলেও মুকুলের শব্দগুলো এখনও অনেকের বুকে ঘুরছে। আত্মসম্মান থাকলে আর এই দলটা করা যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: