মমতা ব্যানার্জিকে খারাপ ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, অথচ যারা এখন তৃণমূলে বড় পদে আছেন

এঁরাই এখন তৃণমূলের চালিকাশক্তি। অথচ একটা সময় এঁরা মমতা ব্যানার্জিকে নানাভাবে আক্রমণ করেছিলেন। আসলে এটাই রাজনীতি। রাজনীতিতে কেউ স্থায়ী শত্রু বা বন্ধু হয় না। মমতা ব্যানার্জি যত তাড়াতাড়ি রেগে গেলে কারও কাছ থেকে সব কেড়ে নেন, তত তাড়াতাড়িই তাঁর ভুল ক্ষমা করে কাছে টেনে নেন। আর দিদির এই স্বভাবের জন্যই এঁরা তৃণমূলে আজ বড় ক্ষমতায়।

দেখুন তৃণমূলের সেইসব নেতা-সাংসদ-মন্ত্রীদের যারা একসময় মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন।

৬) সুব্রত মুখার্জি

Minister Subrata Mukherjee along with other minister at Nabanna, Howrah, after the first cabinet meeting in the new West Bengal secretariat which has been transferred from Writers Building Kolkata. Express Photo by Partha Paul. 22.10.2013. Kolkata.

জার্সি বদলের রেকর্ডটা তাঁর আছে। আজ কংগ্রেস, তো কাল তৃণমূল। পরশু তৃণমূল, তো তার পরদিন ব্যাক টু কংগ্রেস। তৃণমূলে থাকা অবস্থায় কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনের রাজ্য সভাপতি ছিলেন। ২০০৬ নির্বাচনের আগে দল ছেড়ে মমতাকে আক্রমণ করে সুব্রত বলেছিলেন, মমতা হলেন সিপিএমের লক্ষ্মীপেঁচা। মমতার জন্যই সিপিএম ক্ষমতায় আছে। তারপর কলকাতা পুরসভা ভোটের আগে ততকালীন মেয়র সুব্রত দল ছাড়েন। তখন মমতাকে পাগলী বলেও কটাক্ষ করেছিলেন। পরে অবশ্য তৃণমূলে ফিরে মন্ত্রী হয়েছেন। মমতার মন্ত্রিসভার তিনিই সবচেয়ে কাজের মানুষ।

৫) ইন্দ্রনীল সেন


বাম জমানায় বুদ্ধিজীবী তালিকায় থাকা ইন্দ্রনীল বহুবার মমতা ব্যানার্জিকে আক্রমণ করেছিলেন। গানও ধরেছিলেন। তবে দিদি ক্ষমতায় আসবে বুঝে ইন্দ্রনীল পাল্টি মারেন। ২০১৬ বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী হন। ইন্দ্রনীল দিদির দলে মাঝেমাঝেই বোঝা হয়ে যান। অনেকেই ইন্দ্রনীল দিদির হারমোনিয়াম বলে কটাক্ষ করেন। তৃণমূলে আসার পর ইন্দ্রনীলকে নিয়ে অবশ্য বিতর্ক কম হয়নি। মুর্শিদাবাদ জেলা পর্যবেক্ষক হিসেবে তাঁর বর্ষপূর্তির দিনেই পদ খোয়ালেন ইন্দ্রনীল সেন। গত লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্রে সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি ভোটে পরাজয় সত্ত্বেও কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের কর্মিসভা থেকে মুর্শিদাবাদ জেলার দলীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে ইন্দ্রনীলকেই বেছে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩০ মে, দলনেত্রীর সেই ঘোষণার পরে ক্রমান্বয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন বাংলা সঙ্গীত জগতের এই পরিচিত শিল্পী। তাঁর ‘স্বেচ্ছাচারের’ বিরুদ্ধে তোপ দেগে দলে ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলা নেতাদের অনেকেই। কারও গিয়েছিল মন্ত্রিত্ব, কাউকে বা ছেঁটে ফেলা হয়েছিল দল থেকেই।

৪) মানস ভুঁইয়া


২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে মমতাকে হারাতে তিনি সূর্যকান্ত মিশ্র-সুজন চক্রবর্তীকে গলায় টেনে নিয়েছিলেন। জেলায় জেলায় গিয়ে বলেছিলেন, মমতাকে হারাও। মমতার মানসিক ভারসাম্য কিছু নেই বলেও মানস বলেছিলেন। কিন্তু সেই মানসই তাঁর বিরুদ্ধে একটি খুনের মামলায় জড়িয় যাওয়ার পর, কংগ্রেসে কোণঠাসা হয়ে মানস জার্সি বদল করেন। ৪০ বছর ধরে কংগ্রেস করার পর মানস যোগ দেন তৃণমূলে। মানস দিদির দলে এসে সাংসদ হন। সেই সবংয়ে নিজের স্ত্রী-কে বিধায়ক বানান। তৃণমূলে এখন বড় পদে আসিন। অথচ এই মানসই বহুবার মমতাকে খারাপ ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। ২০১৬ বিধানসভা ভোটের সময় মানস কংগ্রেসের সভায় বলেছিলেন, গোটা মেদিনীপুর জুড়ে জাল নোটের কারবার চলছে, তোলাবাজি বেড়ে গিয়েছে, নেশার সামগ্রী অবাধে বিক্রি হচ্ছে। দিন দিন অপরাধ বাড়ছে। অথচ পুলিশ নির্বিকার। পুলিশ সুপারকে বিঁধে সবংয়ের বিধায়কের মন্তব্য, ‘‘ পুলিস ও আমলাদের নিয়েই প্রশাসনকে চাকরে পরিণত করেছে বর্তমান সরকার।’’সেই মানসই তৃণমূলে এসে বলেন, মেদিনীপুরের আসল রূপকার হলেন মমতা ব্যানার্জি।

২) পূর্ণেন্দু বসু


নকশাল নেতা পূর্ণেন্দু বরবার মমতা ব্যানার্জিকে আক্রমণ করে গিয়েছেন। তবে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে আন্দোলনের সময় মমতার কাছাকাছি থেকে তৃণমূলে যোদ দেন পূর্ণেন্দু। তারপর মন্ত্রী। প্রাক্তন বামপন্থি নেতা ও তৃণমূল সরকারের মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর বক্তব্য, ‘‘মানুষ যেদিন থেকে এটা বুঝেছে, ভোটের মাধ্যমে অপছন্দের শাসককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব, সেদিনই সশস্ত্র আন্দোলন তার গুরুত্ব হারিয়েছে৷ তাই মানুষের এখন আস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি৷’’ সংসদীয় পথে যাঁরা এখন লাল পতাকা নিয়ে আন্দোলন করেন, তাঁদের বামপন্থি বলে মানতে রাজি নন মন্ত্রী৷ এই বামপন্থিদলগুলোকে খারিজ করলেও বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেননি তিনি৷ পূর্ণেন্দু বসুর মন্তব্য, ‘‘যতদিন পৃথিবীতে শোষণ-নিপীড়ন থাকবে, ততদিন বিদ্রোহ-বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা ফুরোবে না৷’’

১) সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়


২০০৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে মমতা ব্যানার্জি তাঁকে উত্তর পূর্ব কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকে অন্যত্র দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। সেই রাগে দিদির বিরুদ্ধে তোপ দেগে দল ছেড়েছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। সুদীপ তখন বলেছিলেন, মমতা ব্যানার্জি কোনওদিন রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। দিদির জন্য সিপিএম ক্ষমতায় আছে বলে তোপ দাগেন সুদীপ। অবশ্য পরে সুদীপ তৃণমূলে যোগ দিয়ে উত্তর কলকাতা থেকে সাংসদ হন পরের ভোটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: