ভারতের পাঁচ টেস্ট তারকা, যাঁরা একদিনের ক্রিকেটে নিজের জায়গা পাকা করতে ব্যার্থ!

ক্রিকেট এমন একটা খেলা, যেখানে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। এখানে প্রতিনিয়ত ফর্ম্যাট বদলে চলে। ফলে, একজন ক্রিকেটারকে চটজলদি সেই ফরম্যাটের ধাঁচে নিজের খেলাকে ক্রমশ অদল-বদল করতে হয়। ব্যাপারটা কিন্তু খুব সহজ নয়। টেস্ট, ওডিআই এবং টি-২০ – তিনটি ফরম্যাটই একে অপরের থেকে আলাদা। টেস্টের আসরে সফল হতে গেলে ধৈর্য্য দরকার। টি-২০’তে দরকার চটজলদি সিদ্ধান্ত। আর ওডিআই ক্রিকেট খেলতে গেলে দু’টিকে মিশিয়ে দিতে হয়।

ক্রমশ পরিবর্তনশীল যুগে খেলার ধারার সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নেওয়া একটা বড় ব্যাপার। এই কারণেই বলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ একটা ক্রিকেটারের থেকে তাঁর সেরাটা বের করে আনে। আবার অনেক প্রতিভাকে শেষ করেও দেয়। আন্তর্জাতিক আসরে একটা ব্রেক পাওয়ার থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আন্তর্জাতিক আসরে টিকে থাকা। দেশের জন্য নিজের সেরাটুকু নিংড়ে দেওয়া। কারণ, একজন ক্রিকেটার ছোটো থেকে বড় হওয়ার পথে ওই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্যই নিজের পুরো সময়টা উৎসর্গ করে থাকেন।

বলা হয়, টেস্ট ক্রিকেট হলো পরীক্ষার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এখানে পারফর্ম করতে পারলে নাকি, অন্য যে কোনও ফর্ম্যাটে সফল হওয়া যায়। কিন্তু, ভারতীয় ক্রিকেটে এমনও উদাহরণ আছে, টেস্টের আসরে মেগাস্টার হয়েও, ওডিআই ক্রিকেট এসে খেই হারিয়ে ফেলেছেন। পারফর্ম্যান্স সেই মাত্রায় পৌঁছোয়নি। ফলে, তাঁদের নামের সঙ্গে টেস্ট স্পেশালিস্ট ক্রিকেটার তকমা জুড়ে গিয়েছে।

ভারতের পাঁচ মহাতারকা, টেস্টের আসরে সফল, অথচ ব্যর্থ ওডিআই তারকা :

৫. মুরলি বিজয়

বর্তমান প্রজন্মের তারকাদের মধ্যে অন্যতম। ইংল্যান্ড সফরের আগে পর্যন্ত তামিলনাড়ুর স্টার ওপেনার টেস্টের আসরে অন্যতম সেরা নাম বলে বিবেচিত হতেন। টেস্টের আসরে ওপেনার হতে গেলে হাতে সলিড টেকনিক থাকা দরকার। বিজয়ের মধ্যে সেই গুন আছে। ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ডেবিউ। বিদেশের মাটিতে ভারতের হয়ে উল্লেখ্যযোগ্য অবদান রাখা বিজয় ৫৯টি টেস্ট অভিজ্ঞ। ৩৯.৩৩ ব্যাটিং গড় নিয়ে রান ৩৯৩৩। শতরানের সংখ্যা ১২টি। ঘরোয়া ক্রিকেটে বিজয়ের সুনাম রয়েছে পরিস্থিতি অনুযায়ী অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলার। দৃষ্টিনন্দন শটও রয়েছে হাতে। আইপিএল ক্রিকেটও বিজয়ের শতরান রয়েছে। ফলে, ভাবা হয়েছিল, ওডিআই ক্রিকেটেও সফল হবেন। কিন্তু, ১৭টি একদিনের আন্তর্জাতিকের থেমে যায় বিজয়ের ওডিআই ভবিষ্যৎ। ২১.১৮ গড় নিয়ে তাঁর রান ৩৩৯। শেষবার ভারতের হয়ে ব্লু জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন ২০১৫ সালে।

৪. ইশান্ত শর্মা

টেস্টের আসরে ভারতের বোলিং ডিপার্টমেন্টের অন্যতম ভরসাযোগ্য নাম। দিল্লির তারকা ফাস্ট বোলার যখন ভারতীয় ক্রিকেটে এসেছিলেন, তাঁকে নিয়ে দুর্দান্ত আশা ছিল। চেহারার উচ্চতা, ক্রিকেটীয় দক্ষতা এবং বলের গতির জন্য ইশান্তকে অনেকেই ভবিষ্যতের গ্লেন ম্যাকগ্রা হিসেবে চিহ্নিতও করেছিলেন। ভাবলে অবাক লাগে, বর্তমানে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অযোগ্য বলে বিবেচিত ইশান্ত ২০০৮ সালে দামি ক্রিকেটার ছিলেন উদ্বোধনী আইপিএলে। কলকাতা নাইট রাইডার্স তাঁকে রেকর্ড সংখ্যক দর দিয়ে টিমে এনেছিল। ২০০৭ সালে টেস্ট ডেবিউ। ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে কেরিয়ার মাইলেজ পায়। সেবার রিকি পন্টিংয়ের মতো চ্যাম্পিয়ন ব্যাটসম্যানকেও সমস্যায় ফেলে দিয়েছিলেন দিল্লির ফাস্ট বোলার। মাত্র ঊনিশ বছর বয়সেই সুপারস্টারের তকমা পেয়ে যান ইশান্ত। কিন্তু, যত দিন গিয়েছে, ওডিআই ক্রিকেটে অচল হয়ে পড়েন। সুযোগ পর্যাপ্ত পেয়েছেন। টেস্ট স্পেশালিস্ট বোলার ইশান্ত দেশের হয়ে ৮০টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১১৫টি উইকেট নিলেও, উইকেট প্রতি রানের গড় ৩০। প্রতিপক্ষকে সহজে রান তুলতে দিলে ওডিআই ম্যাচ জেতা কঠিন। এই কারণেই টেস্ট ক্রিকেটে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে কেরিয়ার। ২০১৬ সালে শেষবার ওডিআই আসরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ৮৭টি টেস্টে ২৫৬টি উইকেট নেওয়া ইশান্ত।।

৩. চেতেশ্বর পূজারা

রাহুল দ্রাবিড় পরবর্তী প্রজন্মে ভারতীয় ক্রিকেটে দেওয়াল হিসেবে খ্যাত সৌরাষ্ট্রের ব্যাটিং তারকা। ভারতীয় দলে আসার পর টেস্টের আসরে নিজের জায়গা পাকা করতে খুব একটা সময় লাগেনি পূজারার। হাতে টেকনিক, শট ও ধৈর্য্য রয়েছে। কিন্তু, দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ওডিআই ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। টেস্ট ডেবিউ ২০১৩ সালে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে। ৬২টি টেস্টে ৪৮০৯ রান রয়েছে। ব্যাটিং গড় ৪৯.৫৭। অথচ ওডিআই ক্রিকেটে এসে অসফল। সমস্যা হলো, দ্রাবিড় যে সময় ক্রিকেট খেলতেন, তখনকার তুলনায় এখন ওডিআই ক্রিকেট অনেকটাই গতিময় হয়ে উঠেছে। বল প্রতি স্ট্রাইক রেট বেড়েছে। সেই জায়গাতেই পিছিয়ে পড়েছেন পূজারা। ৫টি ওডিআই ম্যাচে তাঁর রান মাত্র ৫১। ২০১৪ সালের পর থেকে আর একদিনের ক্রিকেটে দেখা যায়নি পূজারাকে। আইপিএল ক্রিকেটেও সুযোগ হয় না চেতেশ্বরের।

২. অজিঙ্কা রাহানে

বর্তমান প্রজন্মের ভারতীয় দলের অন্যতম তারকা। টেস্টের আসরে সহঅধিনায়ক সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ব্রাত্য। সুযোগ অবশ্যই পেয়েছেন, কিন্তু পারফরম্যান্স আশানুরূপ হয়নি। জাত ওপেনার অথচ তাঁকে মিডল অর্ডারে মানিয়ে নিতে হতো। চেষ্টা করেছেন খেলার, কিন্তু ওপেনিং ছাড়া বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ ওডিআই আসরে। রাহানে টেস্টের আসরে আবার মিডল অর্ডারে খেলেন এবং সফলও। হাতে টেকনিক যেমন রয়েছে, তেমনই ধৈর্য্য মুম্বইয়ের তারকার। টেস্ট ডেবিউ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে। তারপর থেকে পাঁচদিনের ক্রিকেটে ৫০টি ম্যাচ খেলেছেন। ব্যাটিং গড় ৪০.৯০ আর রান ৩১৫০। টেস্টের আসরে ভারতীয় লোয়ার মিডল অর্ডারের বিশ্বস্ত নাম ওডিআই ম্যাচ খেলেছেন ৯০টি। রান ২৯৬২। ব্যাটিং গড় ৩৫.২৬। চলতি বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষবার ওডিআই ক্রিকেটে দেখা গেলেও, গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর থেকে উপেক্ষিত হয়ে আসছেন অজিঙ্কা। তাঁর পছন্দের পজিশন ওপেনিং হলেও, শিখর ধওয়ন ও রোহিত শর্মার কারণে তা ফাঁকা নেই। আর মিডল অর্ডারে নেমে দ্রুত রান করতে পারছিলেন না রাহানে।

১. ভিভি এস লক্ষ্মণ

ভারতীয় ক্রিকেটের ভেরি ভেরি স্পেশাল ম্যান সর্বকালের অন্যতম সেরা মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান টেস্টের আসরে। লক্ষ্মণের ব্যাটিংয়ে মধুরতা ছিল। কব্জির মোচড়ে বলকে বাউন্ডারিতে পাঠাতে পারতেন। বহু যুদ্ধের নায়ক লক্ষ্মণের এক একটি ইনিংসে ভারতীয় ক্রিকেট বীরগাথা হিসেবে চিরকাল মর্যাদা পাবে। কিংবদন্তি ভিভিএস ভারতের হয়ে ওডিআই ক্রিকেটে খেললেও পারফর্ম্যান্স সেই মাত্রায় নিয়ে যেতে পারেননি। তাঁর খেলার যে স্টাইল ছিল, তাতে গতিময় ক্রিকেটে পিছিয়ে পড়েন। দ্রাবিড় তিন নম্বরে খেলায় যেটুকু সময় হাতে পেতেন থিতু হয়ে ইনিংসের গতি বাড়ানোর, সেই সময়টা লক্ষ্মণ কোনও দিন পাননি। ১৩৪টি টেস্ট ৮৭৮১ রানের মালিকের ব্যাটিং গড় ৪৫.৯৭। টেস্ট ডেবিউ ১৯৯৬ সালে। কেরিয়ারে ইতি পড়ে ২০১২’তে। ওডিআই আসরে ১৯৯৮ সালে ডেবিউ করার পর অবসরের বছর ছ’য়েক আগে ২০০৬ সালে শেষবার ব্লু জার্সি গায়ে চাপান। ভারতের হয়ে ৮৬টি ওডিআই খেলে ৩০.৭৬ ব্যাটিং গড় নিয়ে লক্ষ্ণণের রান ২৩৩৮। একদিনের ক্রিকেটে রান করার গতি স্লথ হওয়ায় বাদ পড়তে হয়েছিল গ্রেট ভিভিএস’কে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: