‘অন্তহীন প্রাণ’ এর থিমে অবিনশ্বর আত্মার কথা বলবে উল্টোডাঙা পল্লিশ্রী

আর মাত্র হাতে গোনা দিন বাকি পুজোর। এখন থেকেই আম বাঙালি তালিকা তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছে পুজোর। এবার কোন কোন পুজোয় তারা ভিড় জমাবেন। কোন পুজোর থিম এবার টেনে নেবে দর্শনার্থিদের ভিড়। এখন থেকে শুরু হয়ে গিয়েছে তার ফেহেরিস্ত। আমাদের এবারের পুজো পরিক্রমায় আমাদের পাঠকদের জন্য তাই তুলে আনা হল উল্টো ডাঙার পল্লিশ্রীর থম ‘অন্তহীন প্রাণ’। কেনও এই থিম তার জন্য চলে যেতে হবে পুরাণের যুগে। দ্বাপর যুগে জন্ম নিয়ে মর্ত্যলোকে লীলা করতে আসেন বিষ্ণুর অবতার শ্রীকৃষ্ণ। তিনি নিজের লীলা সাঙ্গ করার পর নশ্বর দেশ ত্যাগ করলে পান্ডবরা আর দেহ সৎকার করেন। চিতায় তার দেহে অগ্নি সংযোগ করলে সমস্ত দেহটি এক মুঠো ভস্মে পরিণত হয়। কিন্তু সমস্ত দেহ পুড়ে গেলেও অক্ষত রয়ে যায় শ্রীকৃষ্ণের হৃৎপিন্ড।

পান্ডবদের অবাক করে হঠাৎই হয় দৈববাণী। সেই দৈববাণীর আদেশ পেয়েই পান্ডবরা কৃষ্ণের হৃৎপিন্ড নিক্ষেপ করেন সমুদ্রের জলে যা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক কাষ্ঠ খন্ডের। পরে পুরীর রাজা ইন্দ্রদুম্ন দৈব আদেশে খুঁজে পান সেই কাষ্ঠ খন্ড। তা উদ্ধার করে নিয়ে এসে সেই কাষ্ঠখন্ড দিয়ে ইন্দ্রদুম্ন নির্মান করান জগন্নাথ মূর্তি আর তার মধ্যেই স্থাপন করে চিরন্তন সত্য দারুব্রহ্ম। অর্থাৎ জগতের প্রধান চালিকা শক্তি অথবা প্রাণ। পুরাণ নির্ভর এই দারুব্রহ্ম থেকেই উঠে এসেছে উল্টোডাঙার পল্লিশ্রীর থিম পুজো ‘অন্তহীন প্রাণ’।

এবার তাদের পুজো পা দিয়েছে ৭০তম বর্ষে। আর তাকে স্মরণীয় করে রাখতেই দারুব্রহ্ম নির্ভর তাদের পুজোর থিম। আদি নিয়ম অনুসারেই রাতের আঁধারে পুরীর সমস্ত আলো নিভিয়ে সেই সঙ্গে মন্দিরের পুরোহিতের হাত পর্যন্ত এমনকী চোখেও কাপড় দিয়ে ঢেকে পুরোণ জগন্নাথ মূরতির ভেতর থেকে বার করে এনে দারুবহ্মকে স্থাপন করা হয় নতুন মূর্তির ভেতরে। এভাবেই নশ্মর জীবনচক্রের মধ্যে মিলিয়ে যান শাশ্বত ভগবান। একজন সাধারণ ভক্তের মতই দেহত্যাগ করেন তিনি। তার দারুবহ্মরূপী আত্মা ধারণ করে নতুন দেহ। দেবী দুর্গাও সেই প্রাণেই প্রাণবন্ত। তিনিও প্রতিবছর কন্যারুপে মর্ত্যধামে আসেন। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় খড়-মাটি-কাদার ভিতর থেকে জেগে ওঠেন অসুরদলনী দেবী দূর্গা। পল্লিশ্রীর এই থিমের পুরো বিষয় ভাবনার পেছনে রয়েছেন শিল্পী মলয় এবং শুভময়। এই দুই শিল্পীর মনের মাধুরী মিশিয়েই প্রাণ পেতে চলেছে ‘অন্তহীন প্রাণ’। এই দুই শিল্পীর কথায়, চক্ষুদান এবং প্রান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাগ্রত হন মা। মৃণ্ময়ী থেকে দেবী হয়ে ওঠেন চিন্ময়ী। আবার বিসর্জনের সময় দেবী চিন্ময়ীরূপ ছেড়ে সাধারণের মতই গঙ্গায় অবগাহন করেন। পরের বার আবার সেই গঙ্গা থেকেই মাটি তুলে এনে প্রাণ দেওয়া হয় দেবীকে। অর্থাৎ শরীর নশ্বর কিন্তু আত্মা চিরন্তন অবিনশ্বর। যেখানে প্রাণ অন্তহীন সেখানে মায়ের ভূমিকা থাকবে না তা কি হয়।


জন্ম এবং প্রাণ পেতে ভগবান হোক বা সাধারণ মানুষ, সকলকেই নির্ভর করতে হয় মায়ের উপরই। পল্লিশ্রীর থিমে তাই থাকবে মা এবং সন্তানের সম্পর্কও। মলয় এবং শুভময়ই তৈরি করে দিয়েছেন প্রতিমার স্কেচ, রঙ এবং আকার। শিল্পী পরিমল পাল সেই মতই তৈরি করছেন মূর্তি। । থাকছে মাটি থেকে ৬ ফুট উঁচু গ্যালারির মাধ্যমে মূল মন্ডপে প্রবেশ করার পথ। প্রাণের আধার দর্শনার্থিদের বোঝাতে থাকছে দারুব্রহ্ম। কিন্তু তার খুব কাছাকাছি যেতে পারলেও তাকে স্পর্শ করতে পারবেন না তারা। কারণ দারুব্রহ্মকে ছোঁয়া যায় না। মন্ডপ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে শাড়ি এবং বিভিন্ন ভাস্কর্য। থাকছে শ্রীকৃষ্ণ এবং জগন্নাথের মূর্তিও। তাদের এই অভিনব উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে ভিড় বাড়াবে সাধারণ মানুষ এমনটাই ধারণা পল্লীশ্রীর উদ্যোক্তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: