এবার থেকে ট্রাফিক নিয়ম ভাঙলে দশগুণ বেশি জরিমানা, খুব তাড়াতাড়ি আসছে নতুন বিল

রাস্তাঘাটে ট্রাফিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে যাওয়ার অভ্যাসে লাগাম টানতে চলেছে সরকার। কোই পরওয়া নাহি মনোভাব আর বরদাস্ত করা হবে না। আরও কড়া হতে চলেছে ট্রাফিক নিয়ম-কানুন। সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন ও জাতীয় মহাসড়ক মন্ত্রক মোটর ভেহিকেল বিলে একাধিক সংশোধন আনতে চলেছে। উদ্দেশ্য, রাস্তাঘাটকে আরও নিরাপদ করে তোলা এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা যতোটা সম্ভব কমানো। আর সেই কারণেই মোটর ভেহিকেল বিল অ্যাক্ট, ১৯৮৮-তে পরিবর্তন এনে বিধিনিষেধ আরও কড়া করা হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল যাত্রীদের জন্য।

ইতিমধ্যে, নতুন বিলটি লোকসভাতে পাশও হয়ে গিয়েছে। এবার তাতে শুধু রাজ্যসভার অনুমোদন পড়ার অপেক্ষা। একবার তা হয়ে গেলে ভারতের রাস্তাঘাটে বেপরোয়া যানবাহন চালানো রুখতে কড়া পদক্ষেপ নিতে পারবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বলা হচ্ছে, আমূল পরিবর্তন নিয়ে অপেক্ষা করছে বিলটি। আগামী দিনে ট্রাফিক নিয়ম ভাঙলে দিতে হবে মোটা আর্থিক জরিমানা।
মোটর ভেহিকেল বিলে যেসব উল্লেখনীয় পরিবর্তন আসতে চলেছে, তার মধ্যে রয়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া এবং গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের জন্য এবার থেকে আধার কার্ড বাধ্যতামূলক তো বটেই, আবশ্যকও। বিলে থাকা পরিবর্তনগুলি একবার লাগু হয়ে গেলে সারা দেশজুড়ে অভিন্ন রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালুর জন্য লাইসেন্স কর্তৃপক্ষগুলিকে সম্পূর্ণরূপে কম্পিউটারাইড করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে যাবে।

প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যসভায় বিল অনুমোদিত হয়ে গেলে তৈরি হবে ন্যাশনাল রোড সেফটি বোর্ড। পাশাপাশি, পরিবহনে ব্যবহৃত গাড়িগুলির থেকে নির্গত ধোঁয়ার পরিমাণে রাশ টানতে স্বয়ংক্রিয় ফিটনেস টেস্টিং ব্যবস্থাও চালুর কথাও বলা হয়েছে বিলটিতে। আরও জানা গিয়েছে, যানবাহন সংক্রান্ত থার্ড পার্টি বীমা এবং ক্যাব অ্যাগ্রেগেটরদের জন্যও নির্দেশিকা থাকতে চলেছে এতে।

ট্রাফিক নিয়ম উলঙ্ঘনকারীদের জন্যও অপেক্ষা কড়া জরিমানার গেরো। বেশ কয়েকগুন বাড়াতে চলেছে এই পরিমাণ। আগামী দিনে কোনও নাবালকের হাতে কোনও গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটলে অথবা নিয়ম উলঙ্ঘন হলে গাড়ির মালিককেও ধরা হবে। এমনকী, নিম্নমানের গাড়ি তৈরির জন্য গাড়ি নির্মাতা সংস্থাকেও দায়ী করা হতে পারে।

নতুন মোটর ভেহিকেল বিলের আওতায় আগামী দিনে ট্রাফিক নিয়ম উলঙ্ঘনের সর্বোচ্চ জরিমানার পরিমাণ একলক্ষ টাকা পর্যন্ত দিতে হতে পারে। রাজ্যসরকারগুলি চাইলে তার পরিমাণ দশগুণ বাড়াতে পারবে। অপরদিকে, নতুন বিলটিতে দুর্ঘটনা অথবা ট্রাফিক নিয়ম উলঙ্ঘনের ঘটনার ক্ষেত্রে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষার ব্যাপারটিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম ও পরিচয় গোপন রাখার জন্য একাধিক নতুন পদক্ষেপের উল্লেখ রয়েছে এতে।

নতুন মোটর ভেহিকেল বিলটিতে যেসব উল্লেখনীয় ব্যপারগুলি রয়েছে:
• মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন জরিমানার পরিমাণ ২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০,০০০ টাকা করা হচ্ছে।
• বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য জরিমানা ১,০০০ থেকে বেড়ে ৫,০০০ টাকা হচ্ছে।

• গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইলে কথা বলার ক্ষেত্রে জরিমানা ১,০০০ থেকে বেড়ে ৫,০০০ টাকা হচ্ছে।
• অত্যধিক গতিতে গাড়ি চালানোর জরিমানা এখনকার নিয়ম অনুযায়ী ৪০০ টাকা হলেও, তা বেড়ে ১,০০০-২,০০০ টাকা হতে চলেছে।

• সিট বেল্ট না বেঁধে গাড়ি চালানোর জন্য বর্তমানে ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়, তা বেড়ে ১,০০০ টাকা হতে চলেছে।
• লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ নূন্যতম ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫,০০০ টাকা হচ্ছে।

জরিমানা ছাড়াও মোটর ভেহিকেল অ্যাক্টে অন্যান্য আরও নির্দেশ যু্ক্ত হতে চলেছে:

• গাড়ি দিয়ে পিষে মেরে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ লক্ষ বা তার অধিক টাকা দিতে হবে। বর্তমানে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধি ২৫ হাজার টাকা।

• কোনও নাবালক দ্বারা দুর্ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকলে, তার অভিভাবক অথবা গাড়ির মালিককে দায়ী করা হবে, যদি না তারা এটা প্রমাণ করতে পারেন যে সংশ্লিষ্ট নাবালককে তারা আটকাতে চেয়েছিলেন বা তাদের অজান্তে সংশ্লিষ্ট নাবালক ওই দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। দুর্ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এবার থেকে বাতিল হয়ে যাবে এবং জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের অধীনে সংশ্লিষ্ট নাবালকের বিচার হবে।

• ড্রাইভিং লাইসেন্স পুনর্নবীকরণের সময়সীমা একমাস থেকে বাড়িয়ে একবছর করা হচ্ছে, মেয়াদ ফুরোনোর আগে ও পরে।
• স্বেচ্ছায় সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা ব্যক্তি – দুর্ঘটনাগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা ব্যক্তিদের নাগরিক অথবা ফৌজদারী দায়বদ্ধতা থেকে রক্ষা করা হবে। পুলিশ অথবা চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রদানকারী আধিকারিকদের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের নাম জানাবেন কি জানাবেন, তিনিই ঠিক করবেন।

আগে বিনা হেলমেটে গাড়ি চালালে ১০০ টাকা ফাইন করা হতো, এখন তা বেড়ে হতে পারে ৩০০ টাকা

গাড়ি বীমা সংক্রান্ত যেসমস্ত নিয়ম কার্যকর হতে চলেছে:

• ২০১৬ সালের বিলে থার্ড পার্টি গাড়ি বীমার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতার পরিমাণ ছিল – মৃত্যুর ক্ষেত্রে ১০ লক্ষ এবং গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে ৫ লক্ষ। এবার সেই ধাপ উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

• নির্দিষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে, মোটর ভেহিকেল অ্যাক্সিডেন্ট ফান্ড ভারতের সমস্ত পথযাত্রীকে (দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত) ক্ষতিপূরণ দেবে।

বিলটিতে আর যেসব নতুন সংযোজন রয়েছে, তা হলো – নিম্নমানের গাড়ি তৈরির পাশাপাশি খারাপ সড়ক তৈরির জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট নির্মাণকারী সংস্থা অথবা কর্তৃপক্ষকে দোষী ধরা হবে। যেমন দুর্ঘটনায় যুক্ত থাকা কোনও গাড়ির কোনও উপাদান অথবা ইঞ্জিন যদি তুলনায় নিম্নমানের হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট গাড়ি নির্মাতা সংস্থাকে তা ফেরত নিতে হবে এবং তার সঙ্গে তার ওপর ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক জরিমানা চাপানো হবে। একইরকমভাবে সিভিক এজেন্সি, কন্ট্রাক্টর, কনসালটেন্টকে দায়ী করা হবে ত্রুটিপূর্ণ নকশা তৈরি, সড়ক নির্মাণ এবং নিম্নমানের রাস্তা দেখভালের জন্য (এসংক্রান্ত কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: